টুনু থেকে শিল্পাচার্য

আপডেট : ০৩ জুন ২০২১, ২১:০০

ছোট্ট ছেলেটির ডাক নাম রাখা হয় টুনু।

পড়াশোনার হাতেখড়ি বাড়িতেই। ছোটোবেলা থেকেই আঁকার প্রতি ছিল খুব ঝোঁক। পাখি, পাখির বাসা, মাছ, গরু-ছাগল, ফুল-ফলসহ অনেক কিছুই অনায়াসে এঁকে ফেলতেন নিখুঁতভাবে। এই ছোট্ট ছেলেটিই একদিন সারা বিশ্ব মাতিয়েছিলেন তাঁর আঁকা ছবি দিয়ে।

সমাজের রুচির দুর্ভিক্ষ দূর করতে যে মানুষটি হাতে রংতুলি তুলে নিয়েছিলেন তিনিই আমাদের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন।

তিনি জন্ম নেন ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ জেলার কেন্দুয়ায়। এই মানুষটিকে বাংলাদেশের মানুষ ভালোভাবে জানে এবং চেনে। বাংলাদেশে ছবি আঁকা ও শিল্পকলাচর্চায় তাঁর অবদান অপরিসীম। ছবি আঁকা ও শিল্পকর্ম হলো একটা সুন্দর মনের কাজ। সমাজকে নির্মল করার জন্য, সুন্দরভাবে বাঁচার জন্য, আনন্দে থাকার জন্য ছবি আঁকা একটি সুষ্ঠু বিনোদন—জয়নুল আবেদিন অনেকদিন ধরে ছবি এঁকে, ছবি আঁকার স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করে একথাটা এদেশের মানুষকে বুঝাতে পেরেছিলেন।

আজ এদেশের শিশু-কিশোরদের অনেকেই ছবি আঁকছে। শিক্ষিত পরিবারে বাবা-মা মনে করছেন, ছবি আঁকা শিশুদের জন্য একটি ভালো কাজ, তাদের মেধা বিকাশে সহায়ক তাই তাঁরা শিশুদের নিয়ে যাচ্ছেন ছবি আঁকার স্কুলে, চিত্রপ্রদর্শনীতে ও নানারকম প্রতিযোগিতায়। রং, তুলি, কাগজ তুলে দিচ্ছেন শিশুদের হাতে। দেশে হাজার হাজার শিশু-কিশোর বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কার পাচ্ছে, সুনাম কুড়াচ্ছে। ছবি আঁকার এই বিপ্লবের পেছনে যে মানুষটির অক্লান্ত পরিশ্রম, তিনিই আমাদের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন।

তিনি কচি-কাঁচার মেলার একটি ঘরে একসঙ্গে বসে গল্প করতে করতে শিশুদের আঁকতে বলতেন। শিশুদের জন্য কাগজ, রং, তুলি আগেই প্রস্তুত থাকত। এত রং, কাগজ দেখে আনন্দে কাগজের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ত শিশুরা। ধীরে ধীরে একসঙ্গে বসে গল্প, হাসি ও খেলার মতো করে ইচ্ছেমতো রংতুলি নিয়ে আঁকিবুঁকি করতে করতে এক-একটি ছবি এঁকে ফেলত।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই একদিন কচি-কাঁচার কেন্দ্রীয় মেলায় গিয়ে তিনি অবাক হয়ে যান, প্রায় প্রতিটি শিশুই এঁকেছে প্রিয় মাতৃভূমির ছবি, স্বাধীনতা যুদ্ধের ছবি। আপ্লুত হয়ে তিনি বলেছিলেন, বিশ্বকে জানাতে হবে আমাদের শিশুরা যে দেশপ্রেমিক। জানাতে হবে স্বাধীনতার জন্য অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে তারা কেমন করে লড়ে।

লন্ডনে চিকিত্সার জন্য যাওয়ার সময় শিল্পাচার্য কচি-কাঁচার মেলা আয়োজিত যুদ্ধের অভিজ্ঞতাভিত্তিক বাংলাদেশের শিশুদের আঁকা নির্বাচিত সত্তরটি ছবি সঙ্গে নিয়ে যান। বাংলাদেশের শিশুদের আঁকা ছবির খবর ছড়িয়ে পড়ল লন্ডনে। শুধু লন্ডনেই নয়, অন্যান্য দেশেও। খবরের কাগজে বের হলো এদেশের শিশুদের আঁকা ছবির সংবাদ। সে এক হৈহৈ কাণ্ড, রৈরৈ ব্যাপার!

শিল্পীর তুলিতে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ কতটা বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে জ্যান্তরূপে আবির্ভূত হতে পারে, তা জয়নুলের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবিগুলো না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। ‘নবান্ন’, ‘মনপুরা ৭০’ তাঁর বিশ্ববিখ্যাত চিত্রকর্ম।

শিল্পকলায় অবদানের জন্য বেঁচে থাকতেই তিনি পেয়েছেন শিল্পাচার্য খেতাবসহ বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পচর্চার জনকের উপাধি।

১৯৭৬ সালের ২৮ মে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত চারুকলা অনুষদের পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয় পরম শ্রদ্ধায়।