পুরান ঢাকার নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের দুর্ঘটনাটি দেখিতে দেখিতে এক যুগ পার করিল। ২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীতে বিভীষিকাময় আগুনে ১২৪ জন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হইয়াছিল। তাহার পর গঠিত হইয়াছিল তদন্ত কমিটি। অতঃপর কী হইল? ১২ বত্সর পর আসিয়া আমরা কী দেখিতে পাইতেছি? এক যুগ তথা ১২ বত্সর মানে ৪ হাজার ৩৮০টি দিন। এতগুলি দিন পার হইবার পরও এখনো আগুন-আতঙ্কে দিন কাটে গোটা পুরান ঢাকার মানুষের। যাহারা বিভীষিকা দেখিয়াছে, দিনের আলো নিভিয়া যাইবার পর এখনো তাহাদের মনে আতঙ্কের পারদ চড়িতে থাকে। লালবাগ হইতে হাজারীবাগ, চকবাজার হইতে সিদ্দিকবাজার—এমন কোনো গলি নাই, যেইখানে রাসায়নিকের গুদাম নাই। তাহা হইলে তদন্ত কমিটি কী করিল? তাহাদের প্রতিবেদনই-বা কী দিকনির্দেশনা প্রদান করিল? পরিতাপের কথা হইল, এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটিবার পরও এখনো এই বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির নিকট নাই যে, পুরাতন ঢাকায় ঠিক কী পরিমাণ রাসায়নিকের গুদাম রহিয়াছে। দুঃখজনকভাবে নিমতলী হইতে রাসায়নিকের গুদাম সরানো হইলেও সেইখানে গড়িয়া উঠিয়াছে জুতা ও প্লাস্টিকের বহু কারখানা, যেইখানে মজুত রহিয়াছে বিপুল পরিমাণ দাহ্য পদার্থ।
নিমতলীর দুর্ঘটনার দুই বত্সর পর ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনসের কারখানায় আগুন লাগিয়া ১১৭ জন নিহত হইয়াছিল—যাহা বাংলাদেশে ঘটা বড় অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম। স্বাভাবিকভাবে সেই দুর্ঘটনার পরও তদন্ত কমিটি গঠন করা হইয়াছিল। তাহার পর কী হইল? প্রায় ৯ বত্সর পার হইয়া গিয়াছে—সাভারে তাজরীন ফ্যাশনসের ঘটনাস্থলে গিয়া দেখিয়া আসিতে পারেন যে কোনো উত্সুক পাঠক—এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনার এতগুলি দিন পার হইবার পর কী অবস্থায় রহিয়াছে প্রতিষ্ঠানটি। একটি জরিপে জানা গিয়াছে, বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশে ছয় শতাধিক শ্রমিক আগুনে পুড়িয়া মারা গিয়াছে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর যথারীতি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হইয়াছে। কেবল অগ্নি নহে, যে কোনো দুর্ঘটনার পরই সাধারণত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এইযাবত্কালে নৌ-দুর্ঘটনা বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যায় ঘটিয়াছে। দেখা গিয়াছে বিগত কয়েক বত্সরে নৌ-দুর্ঘটনায় পাঁচ শতাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হইয়াছে। কিন্তু তদন্তের ফলাফল প্রকাশিত হইয়াছে হাতে গোনা কয়েকটির।
বড় বড় প্রতিষ্ঠানে কোনো ঘটনা ঘটিলেই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় কে বা কাহারা দোষী। শুনিতে অবাক লাগিতে পারে—এমন তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ যাহার বিরুদ্ধে উঠে তিনিই আবার তদন্ত কমিটির প্রধান ব্যক্তি। এইগুলিকে প্রহসন ব্যতীত আর কী অভিধায় ভূষিত করা যায়? এইরকম অব্যবস্থাপনা আর অবহেলার শত শত উদাহরণ চারিদিকে। অর্থাত্, তদন্ত কমিটি হয়, বহু ক্ষেত্রেই তদন্ত-তদন্ত খেলা হয়, কিন্তু আসল সমস্যার সমাধান হয় না। তদন্ত কমিটি ঠিকমতো রিপোর্ট দেয় না, আবার রিপোর্ট দিলে তাহা বাস্তবায়িত হয় না। তদন্ত কমিটির মাধ্যমে ঘটনা বা পরিস্থিতিকে নিজেদের মতো করে সুবিধাজনক ব্যাখ্যা দাঁড় করাইবার অভিযোগও অনেক পুরাতন। এই সকল জটিলতার বাহিরে আরো বড় প্রশ্ন হইল—যেই কারণে ঘটনাটি ঘটিল তাহার গভীরে কেন যাওয়া হয় না? গভীরে যাওয়া হয় না বলিয়াই বাহ্যিকভাবে তদন্ত কমিটির মাধ্যমে ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেওয়া হয়। ইহাতে কিন্তু সমস্যার সমাধান চিরকাল অধরাই থাকিয়া যায়। সুতরাং যাইতে হইবে সমস্যার গভীরে। নচেত্ তদন্ত-তদন্ত খেলা চলিতেই থাকিবে। অবশেষে এই প্রশ্নও উঠিতে পারে, তদন্তের যে এত সমস্যা—তাহার তদন্ত কে করিবে?
