জলবায়ু পরিবর্তনের জটিল মান-অনুমান

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:৫৩

সৃষ্টির শুরু হইতে এখন অবধি পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটিয়াছে শত সহস্রবার। ইহা প্রকৃতির একটি নিরন্তর খেলা। কিন্তু প্রায় তিনশত বত্সর পূর্বে শুরু হওয়া শিল্পায়নের পর হইতে এখন অবধি পৃথিবীর তাপমাত্রা দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়িয়াছে। আপাত বিদ্যমান আলামত হইতে এমন উপসংহার টানিয়াছেন সিংহভাগ বিজ্ঞানী।

প্রাকৃতিকভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন বিষয়টি শত শত বত্সর ধরিয়া থাকে। মাত্র তিন শত বত্সরের তথ্যউপাত্ত দিয়া সুনিশ্চিন্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না বলিয়া মনে করেন অনেক বিজ্ঞানী। এই কারণে জলবায়ুর পরিবর্তনকে অনেকে স্রেফ ‘অনুমান’ বলিয়া অভিহিত করেন। এই আলোকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের ধারণাকে ‘ভাঁওতাবাজি’ বলিয়া মনে করেন। এমনকী পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির ঘটনা সত্যি হইলেও তাহার নেপথ্যে আদৌ মানুষের ভূমিকা রহিয়াছে কিনা—তাহা লইয়াও সন্দিহান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। জলবায়ু পরিবর্তনের খাতে তিনি যেমন ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করিতে রাজি নহেন, তেমনি পরিবেশ বিজ্ঞানীদের সুপারিশ বাস্তবায়ন করিয়া লক্ষাধিক কর্মসংস্থানও নষ্ট করিতে চাহেন না। সমপ্রতি তিনি জলবায়ু পরিবর্তন লইয়া এমন একটি টুইট করিয়াছেন, যাহার মন্তব্য ঘরে জমা পড়িয়াছে লক্ষাধিক বার্তা। ২৮ জানুয়ারি করা এই টুইটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলিয়াছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাংশে স্মরণকালের সবচাইতে বেশি ঠান্ডা পড়িয়াছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কী হইল? দোহাই লাগে উষ্ণতা, তাড়াতাড়ি ফিরিয়া আসো, তোমাকে আমাদের খুব প্রয়োজন।

আমরা দেখিয়াছি, ২০১১ সাল হইতে এখন অবধি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প টুইটে শতাধিকবার ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ ও ‘বৈশ্বিক উষ্ণতা’ শব্দগুলি ব্যবহার করিয়াছেন। গত বত্সরও ট্রাম্প মজার ছলে বলিয়াছেন যে, দেশের পূর্বাঞ্চলে রেকর্ড পরিমাণ ঠান্ডা পড়িয়াছে। এই ঠান্ডার সহিত খাপ খাওয়াইতে আমরা সম্ভবত বৈশ্বিক উষ্ণতা কাজে লাগাইতে পারি। যদিও বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যমগুলি বরাবরের মতো এইবারও বলিতেছে যে, ট্রাম্প আসলে জানেন না জলবায়ু ও আবহাওয়ার পার্থক্য। আবহাওয়াকে তিনি জলবায়ুর সহিত গোল পাকাইয়া ফেলিয়াছেন। তবে ট্রাম্প যাহা বলিয়াছেন, তাহাকে অনেকেই এত সূক্ষ্ম কাঁচিতে কাটিতে চাহেন না। মোদ্দা কথা হইল, প্রাক-শিল্পায়নের যুগ হইতে এখন অবধি প্রায় তিন শত বত্সরের হিসাব দিয়া জলবায়ু পরিবর্তনের স্পষ্ট সমীকরণ টানিবার সুযোগ নাই। কারণ পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়—যাহা ঘটিয়া থাকে হাজার হাজার বত্সরের ব্যবধানে। ইহা ঠিক যে, উত্তর গোলার্ধ এই মুহূর্তে যেমন রেকর্ড ঠান্ডায় কাঁপিতেছে, ইহার বিপরীতে দক্ষিণ গোলার্ধে চলিতেছে তীব্র দাবদাহ। উহাও নূতন রেকর্ড। তবে এই রেকর্ডের হিসাবও খুব বেশি অতীতের নহে। যেমন, ১৯৩৯ সালের পর অস্ট্রেলিয়ায় এমন রেকর্ড তাপমাত্রা ওঠে। প্রশ্ন হইল, ১৯৩৯ সালে কেন এত তাপমাত্রা উঠিয়াছিল?

ইহা ঠিক যে, বর্তমান সময়ে সমুদ্র ও স্থলভাগের তাপমাত্রায় পরিবর্তন ঘটিতেছে। ইহার ফলে পরিবর্তন ঘটিতেছে আবহাওয়ারও। তবে তাহা সত্যই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কিনা—সেই সিদ্ধান্ত বিজ্ঞান এখনই দিতে পারিতেছে না। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ যেহেতু ‘বর্তমান’ সময়টাকেই সবচাইতে বেশি গুরুত্ব দেয়, সেই কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের ‘অনুমান’টিকেও অনেকে অধিক ‘মান’ দিতে চাহে।