একটি দেশকে প্রযুক্তি নির্ভর কারিগরি শিক্ষা ছাড়া সমৃদ্ধির পথে, উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। এই বিবেচনায় বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো অনেক দূরে রয়েছে।
স্বাধীনতার ৪৮ বছরে শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে, বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, অবকাঠামোগত পরিবর্তন হয়েছে এবং শিক্ষকদের সংখ্যা বেড়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে পরীক্ষা গ্রহণে নানা পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু এসব শিক্ষা এখনো কর্মমুখী ও কর্ম উপযোগী হতে পারেনি। দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি মারাত্মক ক্ষতিকর দিক হলো, কিছু কিছু স্কুল কর্তৃপক্ষ কেবল পয়সার লোভে কিন্ডারগার্টেন, প্রাক-প্রাথমিক কেজি, নার্সারি, ইংলিশ মিডিয়াম, বাংলা মিডিয়াম প্রভৃতি স্কুল গড়ে তুলছে। শিক্ষায় বিভাজন ও বিভেদ সৃষ্টি করছে। এসব স্কুলে প্লে-গ্রুপ, নার্সারি, কেজি ওয়ান, কেজি টু ইত্যাদি নামে দুই থেকে চারটি পর্যন্ত প্রি-প্রাইমারি ক্লাস চালু করে খুবই ছোট ছোট শিশুদের জীবন ধ্বংস করে চলেছে। এসব ক্লাসের কচি বাচ্চাদের উপর প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা ক্লাসের পড়া তৈরি ও পরীক্ষার প্রস্তুতির নামে মায়েরা এবং প্রাইভেট টিউটররা নির্মম মানসিক অত্যাচার করে চলছেন। আগের দিনে বাচ্চারা পাঁচ-ছয় বছর বয়সে স্কুলে গিয়ে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হতো। এখন এসব স্কুলে ঐ বয়সে নার্সারি, কেজি পড়ে। ফলে জন্মসনদে জন্মতারিখ যাই থাক না কেন, তাদের আসল বয়স বেড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া এসব স্কুলে অযৌক্তিকভাবে আকাশচুম্বী ফি আদায় করে। আবার শিশুদের শিক্ষার ভিত্তি নির্মাণের প্রাথমিক পর্যায়ে অনভিজ্ঞ ,আনাড়ি শিক্ষক নিয়োগ করায় শিশুর ভিত্তি হচ্ছে নড়বড়ে। দালান ত্রুটিযুক্ত হলে তা ভেঙ্গে পুনর্নির্মাণ করা যায়। কিন্তু ক্রটিযুক্ত দেহ-মন-আত্মা নিয়ে বেড়ে উঠা শিশুকে সংশোধণ করা মোটেও সহজ নয়। এই আত্মঘাতী ব্যবস্থার ফল আমাদের সমাজ ইতোমধ্যে পেতে শুরু করেছে। ‘শিক্ষা হল মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের বিকাশ’- সক্রেটিস’-এর এই বক্তব্যের প্রতিফলন ঘটাতে হলে শিক্ষা সংক্রান্ত পরিকল্পনার উপর জোর দিতে হবে।
জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ জননেত্রী শেখ হাসিনার বিশাল সাফল্য। এখন সংশ্লিষ্ট মহলের দায়িত্ব হলো এই নীতির বাস্তবায়ন করা। কিন্তু আমাদের শিক্ষক সমাজে রয়েছে বিভাজন, যেমন সরকারি শিক্ষক, বেসরকারি শিক্ষক, এমপিওভুক্ত শিক্ষক, নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষক প্রভৃতি। এই বিভাজনের মূলে রয়েছে বেতনের বৈষম্য ও প্রাসঙ্গিক সুযোগ-সুবিধার অভাব। বিভিন্ন সরকারি বিভাগের সঙ্গেও শিক্ষকদের সাধারণ বৈষম্য বিদ্যমান। বেতনের বাইরে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বিশেষ করে পরিবহন, আবাসন ইত্যাদি ক্ষেত্রেও শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা সংকুচিত। এগুলোর সমাধান হওয়া প্রয়োজন।
অপরিকল্পিতভাবে স্কুলভবন বিন্যস্ত করা হয়। নতুন ভবন নির্মাণের সময় ছাত্রছাত্রীদের খেলাধুলার জন্য খোলা জায়গার ব্যবস্থা সংকুচিত হচ্ছে। পুরনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ করলে জায়গার সংকট অনেকাংশেই কম হতে পারে। এছাড়া নামীদামি ডাক্তারদের মতো শিক্ষকরাও বাড়ি ভাড়া নিয়ে দিন-রাত এমনভাবে পড়ান, যাতে পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থী ৫+ পায় (আগে ছিল স্টার মার্কস)। রাস্তার ধারে 'অমুক স্যার, তমুক স্যার' নামে বিজ্ঞাপনের বোর্ড ঝুলতে দেখা যায় শহরের বিভিন্ন স্থানে। বর্তমান সময়ে শিক্ষার অবনতির ফলে শিক্ষার্থীরা জ্ঞানচর্চার প্রতি নিবিষ্ট নয়। সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে এখনকার অনেক ছাত্র যতটা বেপরোয়া, তেমনি উন্নত জীবনযাপনের ধান্ধায় শিক্ষকরাও ততটা বৈষয়িক হয়ে ওঠেছে। এর ফলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ বাড়ছে । অবনতি হচ্ছে নৈতিক, সামাজিক মূল্যবোধে।
এসব সমস্যা সমাধানে উপযুক্ত শিক্ষকের ব্যবস্থা করতে হবে, তাদের হাল নাগাদ প্রশিক্ষণ,সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি এবং কোচিং ও গাইড বই বন্ধ করতে হবে। পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করতে হবে। পর্যাপ্ত বৃত্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে। গরীব শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যান্য বৃত্তির সুবিধা মেধার ভিত্তিতে দিতে হবে। শিক্ষার উন্নয়নে সময় উপযোগী,কর্মমুখী,কারিগরি জ্ঞান সম্পন্ন শিক্ষা প্রচলন করতে হবে। শিক্ষাখাতের দুর্নীতি বন্ধে কার্যকর পদপেক্ষ নিতে হবে।
n লেখক: গবেষক
