‘মহিলা’ এবং ‘নারী’ শব্দ দুটো অর্থবোধক দিক থেকে সমার্থক। বাংলা একাডেমি প্রকাশিত সর্বশেষ ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ গ্রন্থে শব্দ দুটির মধ্যে খুব একটা পার্থক্য দেখা যায় না। সেখানে ‘মহিলা’ শব্দের অর্থ লেখা আছে—সম্ভ্রান্ত নারী, যে কোনো নারী বা স্ত্রীলোক। অন্যদিকে ‘নারী’ শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে—স্ত্রীলোক, রমণী, মহিলা, পত্নী। তবে গ্রন্থটিতে ‘নারী’ শব্দের অর্থ প্রকাশ করতে গিয়ে অনুষঙ্গ হিসেবে আরো অনেক শব্দ সন্নিবেশিত হয়েছে। যেমন—নারীজন্ম, নারীদেশ, নারীধর্ম, নারীবিজিত, নারীরত্ন, নারী সত্তমা, নারীসমাজ ও নারীস্বভাব। পক্ষান্তরে, ‘মহিলা’ শব্দের অর্থ প্রকাশে শুধু বলা হয়েছে, সম্ভ্রান্ত নারী ও যে কোনো নারী বা স্ত্রীলোক।
নারী বিষয়ে কিছু শব্দের সঙ্গে (যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহূত) কমবেশি সবাই আমরা পরিচিত। যেমন—নারী জাগরণের পথিকৃত্, নারী আন্দোলন, বীরাঙ্গনা (রণাঙ্গনের বীর নারী), নারী প্রধানমন্ত্রী, নারী স্পিকার, ক্ষমতাধর নারী, নারী শিক্ষামন্ত্রী, নারী দিবস, নারী ভিপি, নারী শিক্ষক, এভারেস্ট জয়ী নারী, নারী উপাচার্য, নারী সংগঠন, নারী সংরক্ষিত আসন, নারী-পুরুষ, সাহসী নারী, নারী সাংবাদিক, নারী বিষয়ক অনুষ্ঠান, নারী উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, নারী মুক্তিযোদ্ধা, নারী সচিব, নারী সাংসদ, নারী বিচারক, নারী লেখক, নারী বিজ্ঞানী, নারী রাষ্ট্রদূত, নারী শ্রমিক ইত্যাদি।
এই নারীই যখন কোনো সামাজিক সমস্যায় পড়েন তখন তাকে ছুটে যেতে হয় ‘মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ কিংবা ‘মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর’-এ। প্রথমেই নামের ধাক্কায় কিছুটা ইতস্ততায় পড়ে সে। পাঠ্যপুস্তক, সেমিনার কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানের গেস্ট কিংবা হোস্ট যে নারী তিনিই কিছু সময়ের জন্য কাগজে-কলমে হয়ে ওঠেন ‘মহিলা’।
আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রায় সব জায়গাতেই ‘নারী’ কথাটি উল্লেখ করেছে। যেমন এবারের একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রকাশিত ইশতেহারে তারা বলেছে, ১. ‘নারী উদ্যোক্তাদের উত্সাহিত করতে তাদের জন্য আলাদা ব্যাংকিং সুবিধা, ঋণ সুবিধা, কারিগরি সুবিধা ও সুপারিশসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’ ২. ‘নারীদের পুরুষের সমান মজুরির নিশ্চয়তা দেওয়া হবে এবং গ্রামীণ নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ও সকল ক্ষেত্রে নারীদের কর্মপরিবেশ উন্নত করা হবে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।’
তাছাড়া, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে ‘মন্ত্রণালয় সম্পর্কে’ বলা হয়েছে—‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার ২০২১ সালের রূপকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নারী ও শিশুদের উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ নারী ও শিশু। তাদের উন্নয়ন তাই জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। নারী ও শিশুর সার্বিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতায়ন এবং সামগ্রিক উন্নয়নের মূল ধারায় সম্পৃক্তকরণের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে নারী দারিদ্র্যবিমোচনের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। নারীর ক্ষমতায়ন, নারী নির্যাতন বন্ধ, নারী পাচার রোধ, কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা বিধান এবং আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ডের মূল ধারায় নারীর পূর্ণ ও সম অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাসহ নারীর সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করাই প্রধান লক্ষ্য।’
স্মার্ট ও ডিজিটাল এই সময়ে যদি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের নাম পালটে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় রাখা যায়—তবে, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ‘নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ কিংবা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর নারী বিষয়ক অধিদপ্তর হতে সমস্যা কী? আমরা জানি, ‘মহিলা’ শব্দটি এসেছে ‘মহল’ থেকে। নারীরা যখন শুধু মহলে আবদ্ধ না থেকে ঘরের বাইরেও দৃপ্তপদে ছড়িয়ে পড়েছেন, তখন এরূপ নাম বেমানান। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখবেন বলে আশা করি।
ঢাকা

