বন্ধ বিশ্ববিদ্যালয় :কী ভাবছে শিক্ষার্থীরা

আপডেট : ০৬ জুন ২০২১, ২১:১৩

কোভিড-১৯ সংক্রমণ কমতে থাকায় সরকারি বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। গণপরিবহনসহ প্রায় সবকিছুই স্বাভাবিক হয়েছে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার। এরই মধ্যে সারা দেশে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবিতে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলে আগামী ১৩ জুন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির এমন ইঙ্গিত দেওয়ার পরদিনই সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা আসে মন্ত্রণালয় থেকে। তবে শিক্ষামন্ত্রীর ১২ জুন পর্যন্ত ছুটি বৃদ্ধির আদেশ প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি প্রদান করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। গত ২৯ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ২৩ মে খোলা হবে। পরে তা আরেক দফা বাড়িয়ে ২৯ মে করা হয়। কয়েক ধাপে বাড়ানোর পর সেই ছুটি এবার আগামী ১২ জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত রয়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবকদের। বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তথা বিশ্ববিদ্যালয় খোলা নিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভাবনা তুলে ধরেছেন— আর এস মাহমুদ হাসান

প্রতিটি শিক্ষার্থীর টিকা নিশ্চিত করতে হবে

—মারজুকা রায়না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

করোনায় আক্রান্ত হয়ে এখনো দেশে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জনের মৃত্যু হচ্ছে। তার মধ্যে অনেকেই আবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধ থাকলেও ক্যাম্পাস খালি পেয়ে হাজার হাজার মানুষের বিচরণ তো রয়েছেই, নেই কোনো সতর্কতা। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে আবাসন সংকট, বিশেষ করে যারা গণরুমে গাদাগাদি করে থাকছে তারা বেশি স্বাস্থ্য সংকটে পড়বে। মেসগুলোর অবস্থাও আরো বেশি নাজেহাল। তাই এই মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিলে করোনা সংক্রমণের হার বেড়ে যাওয়ার  আশঙ্কা অবশ্যই রয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রশাসন কর্তৃক   কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, প্রতিটি শিক্ষার্থীর টিকা নিশ্চিত করে এবং আপাতত করোনাকালীন বহিরামুক্ত ক্যাম্পাস নিশ্চিত করে অতিদ্রুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হোক।

বাড়ছে সেশনজট, মানসিক অবসাদ ও বিষণ্নতা

—সাকিব আহমেদ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

বারবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার তারিখ পেছালেও এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ পায়নি বিশ্ববি-দ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এখনো অনিশ্চয়তার মেঘ কাটেনি। সেশনজটের  সঙ্গে বেড়েই চলেছে শিক্ষার্থীদের মানসিক অবসাদ, বিষণ্নতা এবং নৈরাশা। বেড়েছে ক্যাম্পাসে ফেরার আকুলতা। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ফিরতে চায়, ফিরে পেতে চায় তাদের প্রাণের স্পন্দন। স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমে ফিরে শিক্ষার্থীরা তাদের মস্তিষ্কে জং ধরা নিউরনগুলো সতেজ করতে চায়। আবারও ঘুরে দাঁড়াতে চায় সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানের চর্চায়। তাই অপেক্ষার প্রহর আরো দীর্ঘ না করে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনেই অবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

ভবিষ্যত্ নিয়ে দুশ্চিতায় আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

—মো. মিজানুর রহমান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ক্যাম্পাস খুললে আবাসিক হলে সংক্রমণ নিয়ে সরকার চিন্তিত। কিন্তু যেসব শিক্ষার্থীরা বাসায় অবস্থান করছে, জীবিকার তাগিদে তাদের বাসার সবাই বাইরে যাচ্ছে হরহামেশা, এখানে কি তাদের করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি নেই? যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩য়, ৪র্থ বর্ষে অবস্থান করছেন তারা অল্প কিছুদিনের মধ্যেই কর্মক্ষেত্রের লড়াইয়ে প্রবেশ করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া বেশির ভাগ শিক্ষার্থী নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান।  সবার বাসার সংগতি উচ্চবিত্তদের মতো না। অথচ সরকারি সার্কুলার ঠিকই একের পর এক হয়ে যাচ্ছে, অনেক চাকরির পরীক্ষার লিখিত এবং ভাইভাও হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার ফলে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সঙ্গে পরিবারগুলো আমাদের ভবিষ্যত্ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে আছে। সরকারের প্রতি অনুরোধ, দয়া করে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিন।

অনিশ্চিত জীবন থেকে মুক্তি পেতে চায় শিক্ষার্থীরা

—রিম্পা খাতুন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার নামে দফায় দফায় ছুটি বাড়াচ্ছে সরকার। এদিকে বাস, লঞ্চ, ট্রেন, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, হাটবাজার, শপিংমলসহ সবকিছুই ঠিকঠাক চলছে একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাদে। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেই কি করোনা বিরাজমান? শুধু শিক্ষার্থীরাই স্বাস্থ্যবিধি সম্বন্ধে অজ্ঞ! শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে কেন এতো উদাসীনতা? অনেকে পড়া ছেড়ে মাদক কিংবা অনলাইন গেইমে আসক্ত হয়ে পড়েছে। এছাড়া পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত হাজারো শিক্ষার্থী বই ছেড়ে কাজে লেগে পড়েছে। আজ ছাত্রসমাজ চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি। করোনায় মৃত্যুর চেয়ে আত্মহত্যায় মৃত্যুর হার দ্বিগুণ। যার সিংহভাগ শিক্ষার্থী। এই অনিশ্চিত জীবন থেকে আমরা মুক্তি পেতে চাই, আপন স্রোতে আবার ফিরে যেতে চাই।

শিক্ষাক্ষেত্রে সচল অবস্থা ফিরিয়ে

আনতে হবে

—জান্নাতুল ফেরদৌস প্রিয়া, জাককানইবি

এক বছরেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে ছাত্র-শিক্ষকের অর্ধেক অংশই হতাশাগ্রস্ত। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। এই মেরুদণ্ডই যখন নড়বড়ে তখন শিক্ষার সম্প্রসারণ চিন্তা আকাশ কুসুম কল্পনা। রাস্তাঘাট, দোকানপাট, গণপরিবহন যখন বন্ধ নেই, শ্রমিকের আন্দোলনে যখন সব পরিবহন চালু করে দেওয়া হয়, শিক্ষার্থীরা কেন ক্লাস করতে পারবে না! হাটবাজার বন্ধ থাকলে খাদ্য, বস্ত্রের সংকট দেখা যায়, কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার দরুন চিন্তাশীল সমাজ গঠনে গোটা জাতি বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে। গৃহবন্দি থাকার দরুন অনেক মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে একটা গুরুতর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে গোটা ছাত্রসমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে। সময়ের মাত্রা সংকোচন করে তাই অতি দ্রুত শিক্ষার সচল অবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।