বর্ণবাদমুক্ত পৃথিবী গড়ে তুলি

আপডেট : ০৬ জুন ২০২১, ২১:২৩

তিনি নিখুঁত সুন্দরী কারণ তিনি ফর্সা। ওরতো গায়ের রং ময়লা; কিন্তু চেহারায় মায়া আছে। এই যে ময়লা কথাটি অনেক বাঙালিই ব্যবহার করে থাকে, যখন কোনো মানুষের গায়ের রং কালো হয় তার ব্যাপারে। বিয়ের কনে দেখতে গেলে আগেই দেখা হয় পাত্রীর গায়ের রং কী। অসাধারণ গুণও তখন ফিঁকে হয়ে যায় গায়ের রঙের কাছে। এসব এখনকার কথা নয় বর্ণবাদ চলে আসছে যুগের পর যুগ ধরে। হলিউডের মুনলাইট, গ্রিনবুক, হেল্পসহ আরো অনেক বিখ্যাত সিনেমা আছে যেগুলোতে ফুটে উঠেছে বর্ণবাদ কীভাবে বহু যুগ ধরে ভয়ানকভাবে মানুষের সঙ্গে বাস করছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে এক সময় কালো মানুষেরা এতটাই অবজ্ঞার শিকার হতো, তাদের ব্যবহার করা হতো দাস হিসেবে। অধিকার ছিল না ভালোভাবে বাঁচা কিংবা পড়াশোনা করার। এমন কি তাদের সঙ্গে একই টয়লেটও ব্যবহার করা হতো না। নির্মম অত্যাচার তো চলতই। নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজারের সঙ্গে কালো মানুষকে দাস হিসেবে বেঁচার হাটও বসত। কুয়েন্টিন টারান্টিনো পরিচালিত জ্যাঙ্গো আনচেইন্ড সিনেমায় সেই বর্বরতার দৃশ্য পরিচালক নিখুঁতভাবে দেখিয়েছিলেন। যেখানে দেখা যায়, ক্যান্ডি নামের এক ধনী ব্যক্তি তার কালো দাসদের দিয়ে মান্ডিঙ্গো নামে মল্লযুদ্ধে বাধ্য করে। যেখানে কোনো দাস মারা পড়লে সে পৈশাচিক আনন্দ পেত। গল্পটা সিনেমার হলেও সেসময় এমনই হতো।

যেখানে অন্যায় সেখানে বিপ্লব নিশ্চিত। একসময় কালো মানুষেরা এই জঘন্য অন্যায়ের প্রতিবাদ শুরু করলেন। নেলসন ম্যান্ডেলা ছিলেন এই আন্দোলের অন্যতম প্রধান নেতা। ১৯৬০ সালে শার্পভিলে কৃষ্ণাঙ্গ বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের গুলিতে নিহত হয় ৬৯ জন। ফলে তীব্র হয়ে উঠে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন। সেসময় নেলসন ম্যান্ডেলা একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। যেখানে তিনি বলেছিলেন, সরকার যখন নিরস্ত্র এবং প্রতিরোধবিহীন মানুষের ওপর পাশবিক আক্রমণ চালাচ্ছে, তখন সরকারের সঙ্গে শান্তি এবং আলোচনার কথা বলা নিষ্ফল। গ্রেফতার হন নেলসন ম্যান্ডেলা। শুরু হয় দক্ষিণ আফ্রিকার কুখ্যাত রুবেন দ্বীপে তার দীর্ঘ ২৭ বছরের কারাজীবন। কিন্তু এই আন্দোলন বিস্তৃত হয় আরো কড়াভাবে। একসময় কৃষ্ণাঙ্গরা শ্বেতাঙ্গদের সমান অধিকার পেয়ে যান। ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট হন নেলসন ম্যান্ডেলা। এরপর থেকে কৃষ্ণাঙ্গদের পৃথিবীর বিভিন্ন বড় বড় দায়িত্ব বা পদে দেখা গিয়েছে এবং দেখা যায়।

তবে কি পৃথিবী থেকে বর্ণবাদ নির্মূল হয়ে গেছে? না এখনো বর্ণবাদের জঘন্যতম কীট মানুষের মনের ভেতর সুপ্তভাবে বাস করছে। যার ভয়াবহ প্রমাণ পাওয়া যায় ২০২০ সালে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা ডেরেক শভিন দ্বারা কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক জর্জ ফ্লয়েড হত্যার মাধ্যমে। যার ফলে আবার শুরু হয় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন। গায়ের রং কালো হয় শরীরে মেলানিন নামক পদার্থ তৈরি বেড়ে গেলে এবং মেলানিন কম থাকলে মানুষের গায়ের রং সাদা হয়। অর্থাত্ গায়ের রং কেমন হবে তা মানুষের হাতে নেই। সুতরাং গায়ের রং দিয়ে কারো সৌন্দর্য বিচার করা উচিত নয়। পাখির বর্জ্যও প্রায় সময় সাদা হয়, তাহলে কি পাখির বর্জ্যও সুন্দর! যে মানুষ অন্যকে গায়ের রং দিয়ে বিচার করে, আসল অসুন্দর সে নিজেই। কারণ তার অসুন্দর মানসিকতা । সুতরাং আসুন, মানুষের গায়ের রং নিয়ে নিজেদের অসুন্দর মানসিকতা পরিবর্তন করি, বর্ণবাদমুক্ত সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলি।

n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়