খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি

আপডেট : ০৭ জুন ২০২১, ২১:৩০

সরকারিভাবে খাদ্যশস্যের মজুত বাড়াইবার অন্যতম উত্স ফসলের অভ্যন্তরীণ উত্পাদন। গত বত্সর এই মজুতে ধাক্কা লাগিয়াছে। একদিকে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ, অন্যদিকে দফায় দফায় দেখা দিয়াছে ঝড়-বন্যা। বোরো বা আমন কোনো মৌসুম হইতেই কাঙ্ক্ষিত ফসল সংগ্রহ করিতে পারে নাই সরকার। এমনকি বিদেশ হইতে আমদানি করিয়াও আশানুরূপ খাদ্য মজুত বৃদ্ধি করা সম্ভব হয় নাই। খাদ্য মজুত কম থাকায় খোলা বাজারে চাউল বিক্রির কর্মসূচি কোনোরকমে অব্যাহত রাখা গেলেও টিআর-কাবিখার মতো কর্মসূচিগুলো নগদ টাকা দিয়া চালাইয়া নেওয়া হইয়াছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, গত ৩০ মে পর্যন্ত সরকারি গুদামগুলোতে খাদ্যশস্যের পরিমাণ ছিল ৯.১৩ লক্ষ মেট্রিক টন। ইহার মধ্যে চাউল ৬.১৬ লক্ষ মেট্রিক টন ও গম ২.৯৭ লক্ষ টন। অথচ খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য দরকার ১৫ লক্ষ মেট্রিক টন খাদ্যের মজুত। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি কতদূর যাইবে এবং কী পরিস্থিতি দাঁড়াইবে তাহা আমরা কেহ জানি না। পরিস্থিতি খারাপ হইলে ব্যাপক পরিমাণে খাদ্যসহায়তা (ম্যাসিভ রেশনিং) দিতে হইবে। বিস্তৃত পরিসরে চালু করিতে হইবে ওএমএস। এই জন্য এখন আমাদের অন্যতম প্রধান কর্তব্য হইল খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অভ্যন্তরীণ উত্স হইতে সংগ্রহের পাশাপাশি আমদানির কার্যক্রমও অব্যাহত রাখিতে হইবে।

দাবি করা হয়, বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জিত হইলে বিদেশ হইতে খাদ্য আমদানি করিতে হইবে কেন? একসময় দেশে চাউলের ঘাটতি দেখা দিলে কয়েক দশক পূর্বে একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী বলিয়াছিলেন, প্রয়োজনে দেশ বিক্রয় করিয়া হইলেও চাউল আমদানি করা হইবে। দেশে খাদ্য উত্পাদন বাড়িতেছে। আবার জনসংখ্যা বাড়িবার কারণে বাড়িতেছে চাহিদার পরিমাণও। অন্যদিকে শিল্পকারখানা, ঘরবাড়ি প্রভৃতি স্থাপনা নির্মাণের জন্য কমিতেছে কৃষিজমি। তাহার পরও অষ্টাদশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি ও মঙ্গলকাব্যের সর্বশেষ শক্তিমান কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রায়ের সহিত একমত হইয়া বলিতে হয় ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’। ভাতের চাহিদা মিটাইতে হইলে আমাদের এক ইঞ্চি জমিনও পতিত ফেলিয়া রাখা যাইবে না। ১৯৭৪ সালে যে কোনো কারণেই হউক, দেশে খাদ্যসংকট দেখা দিয়াছিল। সেই সংকট হইতে আমরা সেই সময় এই শিক্ষা পাইয়াছিলাম যে, আমাদের সর্বদা ফুড সিকিউরিটি বা খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করিতে উদ্যোগী হইতে হইবে।

গোডাউন বা গুদামঘরে আসলে কী পরিমাণ খাদ্য মজুত আছে তাহা লইয়া অনেক সময় প্রশ্ন উঠে। দেখা যায়, খাদ্য মজুতের যে হিসাব প্রদান করা হয়, আসল মজুত তাহার চাইতে কম। আশার খবর হইল, করোনা পরিস্থিতি চলমান থাকায় এবং করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের খাদ্যসহায়তা দিতে সরকার ২০২১-২২ অর্থবত্সরে খাদ্যনিরাপত্তার উপর বিশেষ জোর দিতেছে। ইতিমধ্যে এই খাতে সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হইয়াছে, যাহা চলতি অর্থবেসরর চাইতে ৩০০ কোটি টাকা অধিক। তবে খাদ্য উত্পাদন বাড়াইতে কৃষক যাহাতে ন্যায্য মূল্য পান, তাহাদের জন্য সার, ডিজেল, কৃষিযন্ত্রসহ নানা উপকরণ যাহাতে সুলভ হয়, সেই দিকটি লক্ষ রাখিতে হইবে। খাদ্যচাহিদা বাড়িবার সঙ্গে সঙ্গে একটি আশাব্যঞ্জক দিক হইল, বঙ্গোপসাগরের মহিসোপানে বাংলাদেশের আয়তন বাড়িতেছে। এই বর্ধিত জমিরও সদ্ব্যবহার করিতে হইবে আমাদের।