চট্টগ্রামে টানা বর্ষণে পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আবহাওয়াবিদ ড. শেখ শহিদুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের ব্যাপারে আগাম অনুমান করা যায় না। অনেক সময় মাঝারি বৃষ্টিপাতেও পাহাড়ধস হতে পারে। তাই এই ভয়াবহ বিপদের ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত। ২০০৭ সালের ১১ জুন ২৪ ঘণ্টায় ২৫৫ মি.মি বৃষ্টির পর চট্টগ্রাম নগরীতে স্মরণকালের ভয়াবহতম পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। নগরীর কুসুমবাগ, কাইচ্যাঘোনা, চট্টগ্রাম সেনানিবাসসংলগ্ন লেবুবাগান, বায়েজিদ বোস্তামী, লালখান বাজারের মতিঝর্ণা পাহাড়সহ সাতটি স্থানে পাহাড়ধসে মাটিচাপা পড়ে মারা যায় শিশু, নারী ও বৃদ্ধসহ ১২৭ জন।
প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমের শুরুতে পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়। বর্ষা শেষ হওয়ার পর পাহাড়ের বাসিন্দারা আবার তাদের ঘরবাড়িতে ফিরে যান। বর্ষা মৌসুম ছাড়া বছরের অন্য সময়ে পাহাড় নিয়ে প্রশাসনের তত্পরতা তেমন একটা চোখে পড়ে না। এ কারণে প্রতি বছরই নগরীর কোথাও না কোথাও পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে থাকে। প্রতিবার পাহাড়ধসে মানবিক বিপর্যয়ের পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থাপনকারীদের উচ্ছেদ ও অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার কাজ শুরু হয়। বৃষ্টির প্রকোপ কমে আসার পর পুনরায় এই কর্মকাণ্ডের গতি স্তিমিত হয়ে যায়। এবারও পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থাপনকারীদের সরিয়ে নেওয়ার তোড়জোর শুরু করেছে প্রশাসন।
২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট নগরীর লালখান বাজার মতিঝর্ণা এলাকায় পাহাড়ধসে চারটি পরিবারের ১২ জন মারা যায়। ২০১১ সালের ১ জুলাই টাইগার পাস এলাকার বাটালি হিলের ঢালে পাহাড় ও প্রতিরক্ষা দেয়াল ধসে মারা যায় একই পরিবারের পাঁচ জনসহ ১৭ জন। ২০১২ সালের ২৬ জুন নগরীর আকবর শাহ, উত্তর পাহাড়তলির বিশ্বকলোনি, মক্কীঘোনা ও জেলার বাঁশখালীতে পাহাড়ধসে মাটি চাপা পড়ে মারা যায় ২৩ জন। ২০১৪ সালের ২০ মে আনোয়ারা উপজেলায় পাহাড় কাটার সময় মাটিচাপায় নিহত হয়েছেন এক শ্রমিক।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের মূলত প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরাই দায়ী। তারাই পাহাড় দখল করে ভাড়াটিয়া বসায় এবং নিয়মিত তাদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করে। পাহাড়ধসের জন্য নির্বিচারে পাহাড় কাটাকেও দায়ী করা হয়। মূলত নব্বইয়ের দশকের পর থেকেই অপরিকল্পিতভাবে পাহাড়কাটা ও পাহাড়ধসের ঘটনা এবং একই সঙ্গে হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এসব প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের বিষয়ে প্রশাসন বরাবরই উদাসীন। বরঞ্চ প্রশাসনের ভেতরে একটি অসাধু চক্রের মদতে পাহাড়ে অবৈধ বসতি গড়ে উঠছে। সরকারের কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া এই চক্রকে নির্মূল করা যাবে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
২০১১ সালে গঠিত পাহাড়ধসের কারণ অনুসন্ধান কমিটির সদস্য সচিব তত্কালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম ইত্তেফাককে বলেন, পাহাড়ধসের জন্য ২৮টি কারণ চিহ্নিত করে আমরা পাহাড়ধস প্রতিরোধে ৩৬টি সুপারিশ প্রদান করেছিলাম। পাহাড়ধসের জন্য শুধু প্রাকৃতিক কারণই নয় মানবসৃষ্ট কারণও দায়ী। দীর্ঘ খরার পর বৃষ্টিপাত হলে অথবা ভূমিকম্প হলে পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেখা দেয়। এর পাশাপাশি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে জনবসতি গড়ে তোলার পেছনে প্রভাবশালী মহল জড়িত রয়েছে। সবার আগে এই মহলকে চিহ্নিত করে তাদের উত্খাত করতে হবে। চট্টগ্রামে অনেক স্বল্প আয়ের লোক পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করে। তারাই এর শিকার হয়। ভূমিদস্যুদের লোভের কারণে প্রতি বছর প্রচুর নিরীহ মানুষ মারা যায়।
জানা গেছে, পরিবেশ অধিদফতরের হিসাবে চট্টগ্রামে ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় আছে। এ পাহাড়গুলো বিভিন্ন সময় অবৈধভাবে কেটে গড়ে তোলা হয়েছে বসতিসহ বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা।
