ভেজাল জ্বালানি তেল ও বিপিসির মডেল ফিলিং স্টেশন

আপডেট : ০৯ জুন ২০২১, ২১:৪৫

ভেজালের দুনিয়ায় ভেজাল কোথায় নাই তাহা নিশ্চয়তা দিয়া বলা যায় না। ভোজ্য তেলে ভেজালের কথা আজ নাই-বা বলিলাম। কিন্তু জ্বালানি তেলেও যে ভেজাল রহিয়াছে এবং এখানেও যে তেলেসমাতি কারবার চলে, তাহা জানিলে অনেকের চক্ষু চড়কগাছ হইতে পারে। কালোবাজারে ‘বাংলা তেল’ বলিয়া যে জ্বালানি তেল পাওয়া যায়, তাহার ব্যবহারে বাড়িয়া যাইতেছে জ্বালানি খরচ, নষ্ট হইতেছে গাড়ির ইঞ্জিনসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি। ক্ষতি সাধিত হইতেছে পরিবেশেরও। একশ্রেণির বেসরকারি রিফাইনারি মালিক, ট্যাংকলরি মালিক, শ্রমিকসংগঠন ও ফিলিং স্টেশন মালিকসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের কারসাজিতে এই ভেজাল তেলের বাণিজ্য এই দেশে অনেকটাই রমরমা। খোদ বিপিসির নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন বিপণন প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীও ইহার সহিত জড়িত বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। ডিপো প্রতিষ্ঠানগুলোর ডিপো পর্যায়ে অধিক দামের তেলের সহিত কম দামের তেলের সংমিশ্রণ ঘটাইয়া এই গোঁজামিল দেওয়া হইতেছে। আবার তাপমাত্রার হেরফের করিয়াও ওজনে কারচুপি করা হইতেছে। এমনকি সেনাবাহিনী ও বিপিসির বিভিন্ন বিপণন প্রতিষ্ঠানের সাবডিপো হইতে পাঠানো তেলে কনডেনসেট মিশানো হয় বলিয়া অভিযোগ তোলে। তাহারা তেলের মান ঠিক রাখিতে ডিপো হইতে ট্যাংকারে তেল ভর্তির পর সিল করিয়া পাঠানোর সুপারিশ করেন। এই পরিস্থিতিতে বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন) জ্বালানি তেলে ভেজাল প্রতিরোধে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে মডেল ফিলিং স্টেশন গড়িয়া তুলিবার প্রতি গুরুত্বারোপ করিতেছে, যাহা অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ।

বিপিসি জ্বালানি তেলে ভেজাল রোধ এবং ইহার পরিমাণ ও মান নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে স্থাপন করিবে নিজস্ব ফিলিং স্টেশন। বর্তমানে সরকারি তেল বিপণনকারী কোম্পানিগুলোর রহিয়াছে চারটি ফিলিং স্টেশন। এখন নিজস্ব অর্থায়নে আরো ফিলিং স্টেশন নির্মাণ করা হইবে। তেলের পাম্প ও ফিলিং স্টেশনগুলির মধ্যে অন্যায্য প্রতিযোগিতা, ভেজাল, মানহীন ও পরিমাণে কম তেল বিক্রয় ও অবৈধ পথে তেল সংগ্রহের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০১৬ সাল হইতে ফিলিং স্টেশন স্থাপনের অনুমোদন বন্ধ ছিল। এখন দেশে নূতন নূতন গাড়ি ও নির্মিত সড়কের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় নূতন ফেলিং স্টেশন স্থাপনের প্রয়োজনীয়তাও দেখা দিয়াছে। ফিলিং স্টেশন স্থাপনে এই নিষেধাজ্ঞা উঠাইয়া নেওয়া এবং বিপিসির নিজস্ব ফিলিং স্টেশন স্থাপনের সিদ্ধান্ত উভয়কে সাধুবাদ জানাইতে হয়। দেশে ২ হাজার ২৬০টি ফিলিং স্টেশন রহিয়াছে। ইহার মধ্যে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ৮২৪টি, যমুনা অয়েল কোম্পানির ৭৩৫টি ও পদ্মা অয়েল কোম্পানির ৭০১টি। এই তিনটি কোম্পানি নিজস্ব অর্থায়নে ও ব্যবস্থাপনায় সকল মিলাইয়া ১০টি ফিলিং স্টেশন পরিচালনা করিতেছে। ইহার সংখ্যা বৃদ্ধি পাইলে জ্বালানি তেল লইয়া ভেজালের দৌরাত্ম্য কিছুটা কমিবে বলিয়া আশা করা যায়। কেননা মডেল ফিলিং স্টেশনগুলির বৈশিষ্ট্য হইবে ইতিবাচক। যেমন—এই সকল স্টেশন হইতে মানসম্মত ও সঠিক পরিমাণে তেল সরবরাহের পাশাপাশি স্টেশনগুলিতে থাকিবে আধুনিক রেস্তোরাঁ, পরিচ্ছন্ন ও মানসম্পন্ন শৌচাগার ও চালকদের জন্য বিশ্রামাগার।

জ্বালানি তেলে ভেজাল করা হইলে ধরন অনুযায়ী দি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম অ্যাক্ট ১৯৩৪, ধারা-২৩ (১), ১৯৭৪ সালের ধারা-৯ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর ধারা-৪১ অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড, জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রহিয়াছে। কিন্তু এই শাস্তির প্রয়োগ তেমন একটা নাই। জ্বালানি তেলের ভেজাল প্রতিরোধ করিতে হইলে পর্যাপ্ত মডেল ফিলিং স্টেশন স্থাপনের পাশাপাশি এই আইনেরও বাস্তবায়ন করিতে হইবে। আবার শুধু তেল নহে, মবিলেও ভেজাল বন্ধ করা দরকার।