শৈশবে বাতাবিবনের অন্ধকার নেমে আসত বাড়ির পাশের হালটের ঢালে। কেউ কেউ তাকে ভয় করে ওদিকে যেত না। আবার কেউ কেউ, বিশেষ করে হাতেগোনা দু-একজনকে দেখেছি সেই বাতাবিবনের অন্ধকারকে কী ভীষণ আয়াসে যাপন করতে। আর এসবই ঘটত পাড়ার শিশু-কিশোরদের ভিতর। সন্ধেনাগাদ যারা স্কুলের মাঠে বা বিস্তৃত খোলা জায়গায় বৃষ্টির ছোপ ছোপ পানি বা সবুজ দূর্বাঘাসে ফুটবল খেলার নেশায় জড়ো হতো; তাদেরকে ফুটবলগুলোর জোগান দিত ওই হাতেগোনা দু-একজন—যারা বাতাবিলেবুর শাখায় হারিয়ে যেতে ভালোবাসত। তারা বাতাবিলেবু ছিঁড়ে বিভোর আনন্দে নিজেরা যেমন ফুটবল খেলত, আবার অন্যদেরকেও সেই আনন্দে ভাসিয়ে দিত। আর যারা ছিল হাতেগোনা উচ্চবিত্তের সন্তান তারা কেউ কেউ বাজার থেকে কেনা দামি ফুটবল নিয়ে মাঠে নামত। তবে গণদৃষ্টি আকৃষ্ট করত বাতাবিলেবু।
কবি, যতক্ষণ না পর্যন্ত গণমানুষের বন্ধু, ততক্ষণ না বড়ো কবি। গণমানুষের বন্ধু মানে তাঁর কবিতার পাঠক প্রচুর হতে হবে, বা ব্যাপক গণমানুষ তাঁর কবিতা পড়বে, এমন নয়। গণমানুষের সুহূদ মানে মানুষ তাঁর মনুষ্যত্বকে ভালোবাসে, মানুষ তাঁর মানবতাবোধকে সমীহ করে, এমন ব্যাপার। তাঁর কবিতা হয়তো এমন যা গণমানুষের বোধের দরজায় কখনো পৌঁছায় না। তিনি ব্যতিক্রম বা প্রচলিত ধারায় লেখেনও না। নিজেকে স্বতন্ত্র করে গড়েন বহু বহু সাধনায়। তাই তিনি সত্য উচ্চারণ করে গণমানুষের পাশে থেকেও হয়তো কবিতা লেখেন সম্পূর্ণ নিজের মতো করে এবং তাঁর কবিতা ব্যাকুল সৃষ্টির ক্ষুধায় অন্য এক নন্দনভুবনে বসবাস করে। তাই বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে কবিকেও চিনে-ওঠা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। তাঁর কবিতার মতো তিনিও হয়তো এক ঘোরের মানুষ হয়ে সবার মাঝে বেঁচে থাকেন। এবং তাঁর প্রস্থানের পর ক্রমশই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তাঁর সৃষ্টির সম্ভার। ক্রমশই প্রকট হতে থাকে তাঁর অভাব।
বাংলাদেশের কুমার নদ আর পদ্মাপাড়ের মোহনা, ফরিদপুর জেলার মধ্য শহরে জন্ম নেওয়া কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী উপরে বর্ণিত বর্ণনা দ্বারা অলংকৃত এক ব্যতিক্রমী কবি। গত শতাব্দির ষাটের দশকে তাঁকে বাংলা কবিতার ভুবনে প্রবেশকালেই দেখা যায় তাঁর কবিতাসজ্জার আসবাবগুলো অনেকটা ভিন্ন, অনেকটা অচেনা প্রকৃতির; তবে বাংলা ও বাঙালির নিঃসন্দেহে। তিনি নিজে যেমন গতানুগতিক ধারায় কবিতা লেখেননি, তেমনি কখনো তাঁর গণমানুষের জনপ্রিয় কবি হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষাও চোখে পড়েনি। একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কবিতার পাঠক খুব বেশি নয়।
তাঁর সাম্প্রতিক লেখা একটি কবিতার উদাহরণ দিতে আগ্রহ বোধ করছি। ‘লালনের মন’ নামে এ কবিতাটিতে তিনি লালনকে বহু ব্যঞ্জনায় পাঠকের কাছে উপস্থাপন করেছেন। একজন সুরসম্রাট, একজন মহত্ কবির মনকে তিনি মানব জীবনের বিবিধ অনুষঙ্গে যেভাবে প্রতীকায়িত করলেন, তা গড়পড়তা কোনো কবির কাজ নয়। তিনি লিখেছেন—‘করুণা ও দয়া বোন / একান্ত আপন / নিত্য নয় মন / তারপরও প্রতিজন / সযতনে করে সমর্পণ / কর্মের সমন / একক লালন’
একই কবিতায় তিনি আবার বলেছেন : ‘করুণার মর্ম / আর দয়ার ধর্ম / সৃষ্টিগর্ভে মাতৃরূপে / সৃষ্টিশর্তে পিতৃরূপে / অপার আনন্দঘন / চিত্ত-তীর্থ নিরূপণ / লালনের মন’
তিনি এককজন অধ্যাত্ম সাধকের মনকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে সমর্পিত করেন, বিষয়টি ভাবনার। মরমীবাদ থেকে সৃষ্টিতত্ত্ব একজন আধুনিকপ্রান্তের কবিকে কতটা বিচলিত করে, তা ‘লালনের মন’ থেকে আমরা অনুমান করতে পারি। কেননা, এই লালন কিন্তু স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে পর্যন্ত ভাবিত করেছিলেন, রবীন্দ সংগীতপ্রতিভাকে প্রভাবিত করেছিলেন লালন। একারণেই বলা যে হাবীবুল্লাহ সিরাজী ব্যতিক্রম তবে বাঙালির মূলধারা বা শাশ্বত ধারাকে কখনো অস্বীকার করেননি। আবার প্রচলিত কাব্যস্রোতের ঢেউ ঘেঁষে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও মানবপ্রেম সংক্রান্ত তাঁর কিছু জনপ্রিয় কবিতাও রয়েছে—যা তাঁকে নিয়ে বিবিধ আলোচনায় প্রায়শ লক্ষযোগ্য।
সিরাজী নিজেকে একজন জেনারেল বলে দাবি করে স্বস্তি পেয়েছেন। কিন্তু পাঠকের স্বস্তির জায়গা হয়তো তিনি আমলে নেননি। কিংবা পাঠকের তৃপ্তিকে তিনি এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু তিনি পাঠককে শিক্ষিত করতে চেয়েছেন। তাই তাঁকে বলা যায় কবিতার কমরেড। তিনি কবিতায় বিপ্লব ঘটানোর আশা পোষণ করতেন হয়তো। শতবর্ষ আগে বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠতম কবি জীবনানন্দ দাশ মনে করতেন, আধুনিক কবিতা বুঝতে হলে পাঠককেও সমানভাবে শিক্ষিত হতে হবে। ধারাবাহিক কবিতাপাঠ ব্যতীত তাকে স্পর্শ করা দুরূহ। তারও অর্ধশতাধিক বছর পরে এসে সিরাজীও ভাবেন তেমন কিছু যে, পাঠককে তৃপ্তি দেওয়া কবির কাজ নয়। পাঠককে কবিতার নবতর বিন্যাসে, নবতর উপস্থাপনায় আবাসন গড়ে দেওয়াই একজন অগ্রসর কবির কাজ। যে কারণে তিনি অনুবাদের জন্যও বেছে নেন দুজন ব্যতিক্রমী কবির কবিতা। একজন জালালউদ্দিন রুমি অন্যজন রসুল হামজাতভ। একজন মরমীবাদের কবি আর একজন সমাজতান্ত্রিক কবি। রুমির কবিতা আজ সারা বিশ্বের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য পাঠ। কয়েকশ বছর পরে রুমি তাঁর সময়ের চেয়েও জনপ্রিয় হয়ে বেঁচে আছেন। হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কবিতা সম্পর্কে তাই স্পষ্ট করে কথা বলা দুরূহ। সময় তাঁকে কীভাবে গ্রহণ করবে, তার ইঙ্গিত রয়েছে কবিতার প্রতিটি শব্দে, স্পেসে, বিষয়-প্রকরণে। এ কথা কেউ জোর দিয়ে বলতে পারে না। পারলে শিক্ষিত সমাজ কখনো বিভ্রান্ত হতো না। একজন কবিকে গণহূদয়ে ঠাঁই পাওয়ার জন্য মৃত্যুর পর শত শত বছর অপেক্ষা করতে হতো না। হাবীবুল্লাহ সিরাজীর পঁয়ত্রিশটি কবিতার বইসহ গ্রন্থসংখ্যা অর্ধ শতাধিক। একুশে পদকসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। আবার প্রকৌশলী থেকে শেষ জীবনে এসে বাংলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানে মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু কোনো প্রলোভন তাঁকে কবিতা থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। সমসাময়িক অনেকের বেলায় এমনটি ঘটলেও তাঁর কবিতা রূপলাবণ্যে তাঁর নিজেকেই অতিক্রম করে যেত। কত মানুষ তো আশি নব্বই একশো বছর বেঁচে থেকে পৃথিবীর কাছে তার ঋণ শোধ করতে অপারগ থাকে। কিন্তু একজন সৃষ্টিচঞ্চল কবিকে কেন একাত্তরেই বা তারও কম সময়ে চলে যেতে হয়—এ জিজ্ঞাসা সমগ্র সৃজনশীল সমাজের। হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কাছে আমাদের আরো পাওয়ার ছিল, তিনি দিতেও চেয়েছিলেন; কিন্তু কোথায় যেন ভ্রান্তি লুকিয়ে ছিল।
