বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছেন বুদ্ধদেব দাসগুপ্ত। সহজ-সরল ন্যারেটিভ ধারার গল্প বলার যে ঐতিহ্য বাংলা চলচ্চিত্রের প্রাণ, সেই ধারা থেকে নিজেকে মুক্ত রেখেছিলেন তিনি। তার নির্মিত বিমূর্ত চলচ্চিত্রগুলো আমাদের বিস্ময়ের মুখোমুখী দাঁড় করায়। গুণী এই মানুষটির সঙ্গে আমার অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। কত কথা, কত স্মৃতি তা বলে শেষ করা যাবে না। বুদ্ধদেব ও তার ছবির অনেক বড় একজন ভক্ত আমি। তার এই প্রয়াণে ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। ভাবতেই পারছি না তিনি আর নেই। আর কখনো তার সঙ্গে দেখা, হাস্যরস-আড্ডায় মেতে ওঠা হবে না। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে তার সঙ্গে আডাডার সেই দিনগুলোর কথা। এক সন্ধ্যায় গোলাম রব্বানী বিপ্লব বুদ্ধদেব দাদাকে নিয়ে এলেন আমাদের বাড়িতে। বিপ্লবের মনে হয়েছিল দাদাকে আমাদের বাসায় নিয়ে এসে আড্ডা দিলে তিনি অনেক বেশি খুশি হবেন। আমাদের আড্ডা ছিল খুব ছোট পরিসরের। খ্যাতিমান পরিচালক আবু সাইয়ীদ, প্রাবন্ধিক আহমাদ মাযহার ও বদ্ধুদেব দাদার বন্ধু প্রেমেন্দ্র মজুমদার ছিলেন সেই আড্ডা-আসরে। শুরু থেকেই নানা ধরনের খাবারের সঙ্গে সঙ্গে আড্ডা জমে উঠলো আমাদের। সুন্দর আর পূর্ণ যুক্তির সঙ্গে প্রতিটি কথা উপস্থাপন করতে পারতেন বুদ্ধদেব দাদা। তার প্রতিটি বাক্য গঠনেই কবিত্ব থাকতো। যে তার আলোচনা-সমালোচনা ও দৃষ্টিভঙ্গির মাঝে লক্ষ্য করা যায়। আমাদের আড্ডাকেও স্মরণীয় করতে সেই কবিত্বরস বিশেষ সহায়ক হয়ে রইলো। তিনি আবশ্য কথা কম বলতেন, শুনতেন বেশি। তবে দাদার অনেক বড় গুণ ছিল, তিনি খুব সহজেই সকলের সঙ্গে মিশে যেতে পারতেন। তাছাড়া খাবারের ব্যাপারে এই বয়সে এসেও যে দারুণ সচেতন ছিলেন তা আড্ডাটা না দিলে বুঝতে পারতাম বলে মনে হয় না। দাদা চলচ্চিত্রে বরাবরই ম্যাজিক তৈরি করতে চাইতেন। ভালোমানের দর্শকরা যাতে তার ভিজ্যুয়ালের কাছে বারবার ফিরে আসেন সেই প্রত্যাশায় কাব্যিক চোখ দিয়ে তিনি সবকিছু নির্মাণ করতে চাইতেন। এ নিয়ে বিপ্লবের এক প্রশ্নে দাদা বললেন, ‘আমি তো একটি ফ্রেমের মাঝে অনেক কথা বলতে চাই। একটা লোক শুধু হেঁটে যায় এটা আমি কখনোই দেখাতে চাই না। আমি চাই লোকটার হাঁটার সঙ্গে শীত-গ্রীষ্ম, ভালো-মন্দ হেঁটে যায়। বলতে পারেন, একটি জীবন হেঁটে যায়।’ আমরা মুগ্ধ হয়ে দাদার কথাগুলো শুনছিলাম। দাদা বললেন, ‘এবার টরন্টো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গিয়ে হোটেলে বসে একটি স্ক্রিপ্ট লিখেছি। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প, টোপ। প্রায় ত্রিরিশ বছর ধরে গল্পটি মাথায় ঘুরছে। হটাত্ অলৌকিকভাবে টোপের চিত্রায়ণ মাথায় ধরা দিল। একটানে ১২ পৃষ্ঠা লিখে ফেললাম। যারা আমার সঙ্গে এই ছবির কাজ করবে তারা সংক্ষিপ্ত এই স্ক্রিপ্ট দেখে হতবাক! কিন্তু আমি কী করে তাদের বোঝাই এই ১২ পৃষ্ঠার আড়ালে হাজার পৃষ্ঠার কথা লুকিয়ে আছে। অনেক না বলা, অদেখা বিষয় থেকে যায়, যা আমি আমার সিনেমাতে দেখাতে চাই।’ মুগ্ধ নীরবতার ভেঙে আবেগতাড়িত হয়ে নির্মাতা আবু সাইয়ীদ দাদাকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন-আপনি কবিতার মতো দৃশ্যায়ন বড় ক্যানভাসে কী করে করেন?
বৃদ্ধদেব দাদা হাসতে হাসতে বললেন, ‘যত মৌনতা থাকবে তত দৃশ্য নির্মাণের ক্ষতাম বাড়বে। ছবির কাজ শুরুর আগে আমি কথা বলা কমিয়ে দিই। শুটিং চলাকালে আরো একা হয়ে যাই। মৌনতাই ভিজ্যুয়াল নির্মাণের শক্তি তৈরি করে।’ দাদার এই দার্শনিক টাইপের কথাগুলো যত শুনছি ততই মুগ্ধতার রেস ছড়িয়ে পড়ছে। মনে হচ্ছিল তার প্রতিটি কথাতেই জাদু রয়েছে। রয়েছে বাস্তবতার চিত্রের পাশাপাশি কিছু অনুমান।
দাদা তার পূর্বসুরিদের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। সেটা সেই আড্ডায় টের পেলাম। তার কথায় বুঝতে পারলাম দাদার প্রিয় নির্মাতা ঋত্বিক ঘটক। সত্যজিত্ রায়ের মতো পুরনো ঢঙে গল্প বলা তিনি পছন্দ করতেন না। তার কাছে সাহিত্য ও চলচ্চিত্র দুটি মাধ্যম মনে হতো। বুদ্ধদেব দাদা ছিলেন সদা উদ্যমী, জেদি আর গভীর শিল্পবোধসম্পন্ন মানুষ। আড্ডায় সাইয়ীদ ভাই দাদার শুটিংয়ের বিভিন্ন দিকগুলো জানতে অনেক বেশি আগ্রহী হয়ে উঠলেন। দাদাও তার সকল প্রশ্ন শুনে মিটমিট করে হাসতে লাগলেন। দীর্ঘ সেই আড্ডায় দাদা বারবার বললেন, ‘যে ছবি বারবার দেখা হয় সেটাই প্রকৃত চলচ্চিত্র। কিছুটা বাস্তবতা আর কিছুটা ম্যাজিক মিশিয়ে আমার চলচ্চিত্র।’
কথাগুলো শুনে আমরা স্তম্ভিত। এরপর কোনালের গান শুনে তাকে আশীর্বাদ করলেন। গল্প আড্ডায় কখন রাত গড়িয়ে গভীর হলো টেরই পেলাম না।
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত’র সঙ্গে লেখক
১১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৪—১০ জুন,
