বুমেরাং হতে পারে করপোরেট কর আরোপের উদ্যোগ

আপডেট : ১৩ জুন ২০২১, ২০:৩৩

এম এ আলআমিন

 

শিল্পোন্নত সাতটি দেশের জোট জি-৭ বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ওপর কর আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে। জুনের প্রথম সপ্তাহে লন্ডনে জি-৭ জোটভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীরা এ ব্যাপারে একটি চুক্তি করেন। জি-৭ এ সিদ্ধান্ত নিলেও পরিকল্পনাটি এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের কাছ থেকে। এর ফলে দীর্ঘদিনের রীতি ভেঙে টেক জায়ান্টদের কাছ থেকে কর আদায়ের পথ সুগম হবে। তবে অনেকে আশঙ্কা করছেন উদ্যোগটি শেষ পর্যন্ত উলটো ফল বয়ে আনতে পারে।

জি-৭ অর্থমন্ত্রীরা জানিয়েছেন, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কর এড়ানোর প্রবণতা রোধে তারা একসঙ্গে কাজ করতে চান। এই লক্ষ্যে তারা অন্তত ১৫ শতাংশ বৈশ্বিক করপোরেট কর আরোপের বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছেন। মাইক্রোসফট, ফেসবুক, আমাজন ও গুগলের মতো বড় বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এই করের আওতায় আসবে। জানা গেছে, মাইক্রোসফটের অধীনস্থ একটি আইরিশ প্রতিষ্ঠান গত বছর ৩১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার মুনাফা করলেও কোনো করপোরেট কর দেয়নি। কারণ, প্রতিষ্ঠানটি ক্যারিবীয় দ্বীপ দেশ বারমুডায় নিবন্ধিত। ট্যাক্স হ্যাভেন বা কর অবকাশ বলে পরিচিত দেশগুলোর একটি হলো এই বারমুডা।

৫ জুন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা, ইতালি, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে এ চুক্তি হয়। করোনা মহামারিকালে চুক্তিটিকে আশার আলো হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, এটি বিভিন্ন দেশের সরকারের জন্য কোটি কোটি ডলার আয়ের একটি ব্যবস্থা করবে, যা কোভিড পরিস্থিতিতে সৃষ্ট ঋণ পরিশোধে খরচ করা যাবে। ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে তার সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, এই ব্যবস্থা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মধ্যে সুষম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করবে। তবে বাম ঘরানা ও ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশের প্রতিনিধিত্বকারীরা বলছেন, বাইডেন জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর কাছে অল্পই কর চেয়েছেন। ট্যাক্স হ্যাভেনের কথা বাদ দিলেও সুইজারল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশ ধনী বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য। কারণ এই দেশগুলোতে করপোরেট করের হার ১২ শতাংশের মতো। সেখানে হার ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ালে তা কোম্পানিগুলোর জন্য বোঝা হবে না। বৈশ্বিক দারিদ্র্য নিয়ে কাজ করা সংস্থা অক্সফামের নির্বাহী পরিচালক গ্যাব্রিয়েলা বুচার বলেন, ‘১৫ শতাংশ হারে কর আরোপ করে জি-৭ যদি মনে করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে করপোরেট কর কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে সেটি বাস্তব সম্মত নয়। বলা হচ্ছে, এটি সর্বনিম্ন হারে কর আরোপ। আয়ারল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরের মতো কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যেই প্রায় সেই হারে কর নিচ্ছে।’

এখানে বিবেচনার যোগ্য বাইডেনের পরিকল্পনা বৈশ্বিক করপোরেট কর কাঠামোয় হয়তো আমূল পরিবর্তন ঘটাবে না কিন্তু এটি এমন সব দেশের রাজস্ব আয়ের পথ সুগম করবে যেখানে ঐ কোম্পানিগুলোর অফিস নেই। ঐতিহ্যগতভাবে বহুজাতিক কোম্পানি বা তাদের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলো ট্যাক্স হ্যাভেন বা স্বল্পহার কর দেশের বাইরে অফিস খোলে না। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ধনী দেশের বাইরের দেশগুলোরও আয়ের একটি সুযোগ তৈরি হবে, যা আগে ছিল না।

বাইডেনের পরিকল্পনার সবচেয়ে যৌক্তিক সমালোচনা হলো এটি ইউরোপীয় গবেষণা সংস্থা ওইসিডির বাতলানো পন্থায় প্রণয়ন করা হয়েছে। অনেকে ১৫ শতাংশের জায়গায় ২১ শতাংশ আরোপের পরামর্শ দিয়েছেন। বাইডেন চেয়েছেন শ্রমজীবীদের ওপর করা না বাড়িয়ে করপোরেট কর খাত প্রসারিত করতে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন ১৯৫০ সাল থেকে শ্রমজীবীদের করের পরিমাণ ৩০ শতাংশ বাড়লেও করপোরেট থেকে কর বেড়েছে মাত্র ৮ শতাংশ। তাই এই কর যুক্তরাষ্ট্রে শ্রেণিগত কর বৈষম্য কমাতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিজও তাই মনে করেন। তবে তিনি প্রস্তাব করেছেন এই হার ২১ শতাংশ হওয়া উচিত। বাইডেনের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো কংগ্রেসের বৈতরণী পার হওয়া। বৈদেশিক চুক্তি দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে পাশ করাতে হয়। কংগ্রেসের উচ্চ কক্ষ সিনেটের অর্ধেক আসনে ডেমোক্র্যাটদের আধিপত্য রয়েছে। অপরদিকে, ফ্রান্স সম্প্রতি টেক কোম্পানিগুলোর ওপর কর ধার্য করেছে। এখন যদি নতুন করে করপোরেট কর বসাতে হয় তাহলে ফরাসি আইনপ্রণেতারা টেকনিক্যাল বাধার মুখে পড়তে পারেন।

করপোরেট কর বুমেরাং হওয়ার সবচেয়ে বড় আশঙ্কাটি হলো চলতি বছর আরো পরের দিকে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। ঐ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ যদি এই কর অনুমোদন করেন তবে দুর্নীতির অভিযোগ আছে এরকম সরকারগুলো এই কর নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে পারে। তাদের জন্য রাজস্ব আদায়ের নতুন এক দুয়ার খুলে যাবে। যেমন ব্রাজিলের কথা বলা যায়। দেশটির বৃহত্ গৃহায়ন প্রতিষ্ঠান গ্রুপো ওডেবেখট। এই গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার জন্য দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা ডি সিলভাসহ অনেক রাজনীতিককে জেলেও যেতে হয়েছে। লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ নিয়েই এ রকম সমস্যা রয়েছে। এসব দেশে বৃহত্ কোম্পানিগুলোর বেশিরভাগই অফশোরে শাখা খুলে বাণিজ্য করে থাকে।