দীর্ঘ এক বছরের অধিক সময় ধরে বন্ধ আছে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। দিন যত গড়াচ্ছে সেশনজটের পাল্লা ভারী হচ্ছে ততই। শিক্ষাজীবনে হঠাত্ নেমে আসা এ স্থবিরতায় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি হতাশ তাদের অভিভাবকও। সন্তানের অনিশ্চিত ভবিষ্যত্ এবং থেমে যাওয়া জীবন রীতিমতো বিষিয়ে তুলছে তাদের। দীর্ঘ সেশনজটের এ ধকল থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্তি দিতে সাম্প্রতিক সময়ে পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার জোর দাবি তোলা হলে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) চার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সশরীরে পরীক্ষা নেওয়ার অনুমতি দেয়। এই চারটি শর্তের একটি হলো : পরীক্ষা চলাকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল খোলা যাবে না। ইউজিসির এ সিদ্ধান্তে কতটুকু খুশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা! এমন সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে কীই-বা ভাবছেন তারা। তাদের ব্যক্ত করা এসব মতামত তুলে ধরেছেন— তানভীর তানিম
আবাসিক হল না খুলে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তির কারণ হবে বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। হঠাত্ করে হল না খুলে পরীক্ষা নিলে শিক্ষার্থীদের থাকার চরম সমস্যা হবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর পরিবারই মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসে। তাদের অধিকাংশের পক্ষে মেস বা ভাড়া বাসায় থাকা সম্ভব না। এতে করে মেয়েরা নিরাপত্তাহীনতায় বেশি ভুগবে। তাছাড়া হল আর মেসের পরিবেশ একই রকম হওয়ায় করোনা ঝুঁকি সব ক্ষেত্রে বিদ্যমান। সুতরাং আমার মতে হল না খুলে পরীক্ষা নেওয়াটা নিতান্তই প্রশাসনের নির্বুদ্ধিতার পরিচয়।
—দীপ্ত বিশ্বাস
প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেশনজট দূরীকরণে পরীক্ষা নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে হল না খুলে পরীক্ষা নেওয়াটা একেবারে অযৌক্তিক বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা। আবার এই করোনা মহামারিতে তাদের আর্থিক অবস্থাও শোচনীয়। এই মুহূর্তে শহরে এসে মেস বা আবাসনের ব্যবস্থা করা তাদের জন্য প্রায়ই অসম্ভব। তাই এই সব শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে হলেও হল খুলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরীক্ষা নেওয়া উচিত বলে মনে করি।
—সিফাতুল্লাহ সিফাত
নৃবিজ্ঞান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
হল না খুলে পরীক্ষা নেওয়াকে ব্যক্তিগতভাবে আমি সমর্থন করি না। পরীক্ষা যদি নিতে হয়, তাহলে হল খুলেই নেওয়া হোক। কারণ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী গ্রামাঞ্চলের। ফলে নিরাপত্তা, খাদ্য ও বাসস্থান নিয়ে প্রায়ই তাদেরকে নানারকম ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেখানে আবাসিক হলই তাদের একমাত্র ভরসার জায়গা। অন্যদিকে কয়েকমাস আগে জাহাঙ্গীরনগর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার দিকে তাকালে আমরা হলবিহীন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা সম্পর্কে জানতে পারি। সেখানে বহিরাগতদের দ্বারা শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন, তাদের কটেজে হামলা, বিভিন্ন নথিপত্র চুরিসহ ঘটেছে অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটনা। এসব ঘটনা যে সামনে আর ঘটবে না সেটার নিশ্চয়তাই-বা কি? তাই হল খুলেই পরীক্ষা নেওয়াটা উচিত।
—নুরুল আমিন
নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকলেও অধিকাংশ বিভাগেরই অনলাইনে বেশ কয়েকটি সেমিস্টার শেষ হয়েছে। কিন্তু পরীক্ষা না হওয়ায় থমকে ছিল আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম। একমাত্র পরীক্ষার মাধ্যমে সম্ভব থমকে যাওয়া অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমকে বেগময় করে সেশনজটের অভিশাপ থেকে আমাদের মুক্তি দিতে। সম্প্রতি পরীক্ষা দেওয়ার একটা যেহেতু সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই আমি মনে করি, হল বন্ধ থাকলেও আমাদের পরীক্ষায় বসা উচিত। তাছাড়া কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের সংখ্যা কম হওয়ায় হল খোলা বা বন্ধ রাখার প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপর খুব একটা পড়বে না বলে মনে হয়।
—মুহসিন জামিল
নৃবিজ্ঞান বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের সেশনজট থেকে মুক্ত রাখতে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তটা অবশ্যই সময়োপযোগী। কিন্তু হল বন্ধ থাকাটা শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। বাড়িতে নেটওয়ার্ক সমস্যাসহ নানাবিধ সমস্যা ও পরীক্ষা উপলক্ষ্যে স্বাভাবিকভাবে শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ এখন নিজ নিজ ক্যাম্পাস বা শহরে ফিরতে শুরু করেছে। শিক্ষার্থীদের আবাসনগত সমস্যা পরীক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তবুও সকল প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে পরীক্ষা হচ্ছে দেখে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তি নেমে এসেছে।
—সামিউল ইসলাম
রসায়ন বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।
