আমরা আসলে কোথায় আছি?

আপডেট : ১৪ জুন ২০২১, ২১:০৬

ঘুষ দেওয়া এবং নেওয়া খারাপ—কিন্তু কথা হইল ঘুষ না-দিয়া সরকারি বেশির ভাগ সেবা কি সঠিক সময়ে পাওয়া সম্ভব? এইখানে কেবল সরকারি সেবামূলক কাজের ক্ষেত্রে ঘুষের কথাই আলোচনা করিব। ঘুষকে অনেকেই আদর করিয়া ‘স্পিড মানি’ বলিয়া থাকেন। অর্থাত্ পকেটের অর্থ খসাইলে সরকারি কর্মচারী, যাহারা তাহাদের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালনের জন্য দেশের জনগণের ট্যাক্স হইতে মাস শেষে মাহিনা পান, তাহারা সেই কাজটি একটু দ্রুত তালে করিয়া দিবেন। প্রশ্ন হইল, সরকারের সেবামূলক কাজেও কেন ঘুষের জোগান দিতে হইবে? তাহা হইলে সরকারি কর্মচারীদের বেতনের দরকারটা কী? পদ অনুযায়ী তাহাদের একটি করিয়া ছোট-বড় ড্রয়ার করিয়া দিলেই তো হয়! ব্যাপারটি একটি রাশিয়ান কৌতুকের মতো :এক তরুণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে চাকুরি পাইবার তিন মাস পরও ব্যাংক হইতে বেতন তুলে নাই। ব্যাংক হইতে যখন জানিতে চাওয়া হইল, তিনি কেন বেতন তুলিতেছেন না? তখন সেই নূতন চাকুরি পাওয়া তরুণের বিস্ময়-উক্তি, ‘এই চাকুরিতে বেতনও পাওয়া যায় নাকি? আমি তো ভাবিয়াছিলাম একটি রিভলবার ধরাইয়া দিয়া আমাকে বোঝানো হইয়াছে উহা দিয়া করিয়া খাও!’

ঘুষের ভালোমন্দ লইয়া হার্ভার্ডের বিখ্যাত পণ্ডিত ড্যানিয়েল কফম্যান বলিয়াছেন—সকল দেশের ক্ষমতাবানেরাই নিজেদের ক্ষমতার কমবেশি অপব্যবহার করেন, ইহা তাহাদের ‘দ্বিতীয় প্রকৃতি’। এখন সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করিয়া তাহারা যদি একটি কাজ ‘দ্রুত’ করিয়া দেন, তাহা হইলে উহা খুব বেশি মন্দ নহে। কিন্তু বিষয়টি কিন্তু শেষ অঙ্কে অন্যায্যই। মহাত্মা গান্ধী একবার এক সভায় বলিয়াছিলেন—ঘুষ নেওয়া ‘অন্যায়’। কিন্তু সভায় উপস্থিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নাকি বাক্যটি শুনিয়াছিলেন এইভাবে—ঘুষ নেওয়া ‘অন্য আয়’। এই অন্য আয়ের স্বাদই আলাদা। মেয়ের বিবাহের সময়ও মেয়েপক্ষ নাকি জানিতে চাহেন—ছেলের বেতন কত তাহা বড় বিষয় নহে, ছেলের ‘উপরি ইনকাম’ আছে কি না—তাহা গুরুত্বপূর্ণ। ঘুষ কেবল এখন নহে, প্রাচীনকালেও ছিল। প্রাচীন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতির পণ্ডিত চাণক্য চল্লিশ ধরনের দুর্নীতির কথা বলিয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছেন—‘জিহ্বার ডগায় বিষ বা মধু থাকিলে তাহার স্বাদ না লইয়া নির্লিপ্ত থাকা অসম্ভব। তেমনি অসম্ভব হইল সরকারের তহবিল কিংবা কাজ লইয়া যারা লেনদেন করেন, তাহাদের একটুকুও সরকারের সম্পদ চাখিয়া না দেখা।’ কিন্তু ঘুষের যে অনেক ক্ষতিকর দিক রহিয়াছে, তাহার ফিরিস্তি শেষ করা যাইবে না। যেমন একজন তাহার অভিজ্ঞতায় জানাইয়াছেন, তিনি প্রতিটি পরীক্ষায় ফার্স্ট হইয়াছেন। কলেজের চাকরির পরীক্ষায়ও ফার্স্ট, অথচ সেই চাকরিটি পাইয়াছেন টেবিলের নিচ হইতে মোটা খাম ধরাইয়া দেওয়া সেকেন্ড ক্লাস পাওয়া একজন। ইহার ফলে শুধু যে যোগ্য প্রার্থী বাদ গেল তাহাই নহে, ছাত্রছাত্রীরাও যোগ্যতর শিক্ষকের নিকট হইতে উন্নত পাঠ গ্রহণ হইতেও বঞ্চিত হইল। লাভ হইল মাত্র দুই জনের, কিন্তু ক্ষতি হইল হাজার মানুষের। ঘুষের ব্যাপারে রাশিয়ানরা কৌতুক করিয়া বলিয়া থাকে যে, ঘুষের উপর ট্যাক্স বসানো যাইতে পারিত, তবে উহা করিলে ঘুষদাতার উপর আরো চাপ পড়িবে। ঘুষ প্রদানের সময় তাহাতে ট্যাক্সের টাকাটাও জুড়িয়া দিতে হইবে যে! ঘুষের ক্ষেত্রে মোক্ষম অস্ত্র হইল—‘হয় ঘুষ দিন, নয়তো সকল কিছু আইন মোতাবেক করা হইবে।’

কথা হইল, ‘অন্য আয়’, উেকাচ, উপরি কিংবা ঘুষ—যাহাই হউক না কেন, উন্নত দেশে সরকারি সেবায় ইহা কল্পনা করা যায় না। আমরা প্রায়শই গাল ফুলাইয়া বলিয়া থাকি—অমুক অমুক দেশ হইতে আমরা আগাইয়া গিয়াছি, অমুক সালে আমরা উন্নতির বিশেষ কাতারে শামিল হইব। উন্নত দেশ হইবার মহাসড়কে আমরা! খুব ভালো কথা, দেশের ভালো কথা শুনিতে কে না চাহে? কিন্তু নিজের প্রকৃত অবয়ব দেখিতে বড় আয়নার দিকে একটু ভালো করিয়া তাকাইতে হইবে। নিজেদের আপাদমস্তক দেখিতে হইবে। তখন উপলব্ধি করা যাইবে আমরা আসলে কোথায় আছি।