অণুগল্প : কাঁঠাল

আপডেট : ১৫ জুন ২০২১, ১৯:২৬

শফিক হাসান

 

‘কাঁডল মাগনা দিলেও তোমার নেওনের ক্ষ্যামতা অইবো না’—এমন উসকানিমূলক বক্তব্যে রাগ করা উচিত ছিল জহিরের। তবু রাগ বা মন খারাপ কোনোটাই করেনি। গরিবের রাগ থাকাটা অনুচিত। মন খারাপ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় আছে। তুচ্ছ কারণে বকাবাদ্যি তাকে বিচলিত করে না।

ছমির মুন্সী ফল ব্যবসায়ী। ধনী-নির্ধন কেউই তার দোকান থেকে খালি হাতে ফেরে না। অথচ এই লোক—জহির, এক মাস ধরে শুধু আসছে যাচ্ছে। কাঁঠালের দাম জিজ্ঞেস করেই চলে যায়। ‘মাগনা দামের’ কাঁঠাল কেনেনি এমন লোক বাজারে আসেওনি। তবু কেউ যদি ফেরত যায়, তাকে ধমক না দিয়ে উপায় কী!

চতুর্থবারের ধমকের পরও জহির ভাবলেশহীন। মায়া হয় ছমির মুন্সীর। সহানুভূতির সুরে বলে, ‘তোমার সমস্যা কী, মিয়া?’

এমন প্রশ্নই সত্যিকারের সমস্যায় ফেলে দেয় জহিরকে। ইতস্তত ভঙ্গিতে বলে, ‘পোলায় কাঁডল খাইতে চাইছিল...।’

‘নিয়া যাও না ক্যান?’

‘এত দামে ক্যামনে কিনি। এক কেজি চাইলের দাম!’

‘তুমি টেরাক ভাড়ার খরচও দিবা না, মিয়া?’

ইয়া বড় সাইজের কাঁঠাল ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সস্তাই বটে। কোয়া ফেলে দিয়ে যদি বিচি বিক্রি করা হয় সের দরে—এর চেয়ে বেশি দাম উঠবে।

বাজারে কুলির কাজ করে জহির। উপার্জনে বাগড়া দিয়েছে করোনাভাইরাস। ছোট বোনের বিয়ে দিয়েছে মাস ছয়েক আগে। সেখান থেকে ঘন ঘন তাগাদা আসছে। প্রতিশ্রুত যৌতুক পরিশোধ করতে হবে। তাদেরও দুঃসময়। সব মিলিয়ে জহিরের দিনমান টালমাটাল। বলা-বিমারটা কবে যে যাবে!

কুলিদের মধ্যে তুলনামূলক সচ্ছল জলিল। সে আজ বাজারের বড় কাঁঠালটা কিনেছে। ভ্যানের ওপরে রেখে বাজারের ইয়ার-দোস্তদের ডেকেছে। কাঁঠাল একা খাওয়ার ফল না। ডাক পড়লে জহির বিব্রত হয়, ‘পোলারে কাঁডল না খাওয়াইয়া আমি খামু না।’

জলিল বলে, ‘পোলার লাইগা দিতাছি। তবু তুমি খাও। জব্বর মিষ্টি।’

ছেলের জন্য পলিব্যাগে মুড়িয়ে দেওয়া কাঁঠাল-কোয়া পেলেও জহিরের গলা দিয়ে নামে না।

অন্ধকার রাতে বাড়ি ফিরতে হয় প্রতিদিন। বৃষ্টিভেজা মেঠোপথে হঠাত্ পিছলে পড়ে জহির। হাতছাড়া হয়ে যায় পোটলাটা। ধানখেতে কাদা-পাঁক মাড়িয়ে অনেকক্ষণ খুঁজল। কয়েকজন হাটুরে টর্চলাইট জ্তালিয়ে সাহায্য করেছে। বেমালুম গায়েব হয়ে গেছে! একজন বলল, ‘উইঠা আহো। পাইলেও কি এই কাঁডল খাওয়াইতে পারবা? সারের পানি ঢুকছে না ভিত্রে!’

টনক নড়ে জহিরের।

 

এদিকে ছমির মুন্সী কয়েকদিন খুঁজেও হদিস পায় না জহিরের। একপর্যায়ে ঠিকানা নিয়ে চলে আসে বাড়িতে। দুই হাতে বড় দুই কাঁঠাল। অবাক-করা এমন দৃশ্যে জহির কোনোভাবে বলতে পারে—‘কাঁডল কিনুম না, বেপারি।’

‘বেচতে আইছি কে কইল! আমার দাদুভাই রে ডাকো, তারে নিজ আতে কাঁডল খাওয়ামু।’

ততক্ষণে বাড়ির বউ-ঝিরাও জড়ো হয়েছে। বেপারির কথা ফিরিয়ে দিয়েছে তাদের শোকের পাহাড়। সম্মিলিত বিলাপে ছমির মুন্সী শোনে—এক সপ্তাহ আগে পাঁচ বছর বয়সি খোকা পানিতে ডুবে মারা গেছে।