যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করতে সম্মত হয়েছেন। বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর গতকাল জেনেভায় প্রথম বারের মতো পুতিনের সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠক করলেন। বৈঠকে দুই দেশই বহিষ্কৃত কূটনীতিকদের পুনরায় ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে সম্মত হয়েছেন। বৈঠককে পুতিন গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ বললেও বাইডেন সেই বিষয়ে কিছু না বললেও দুই দেশের সম্পর্ক উন্নত হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। খবর সিএনএন, বিবিসি ও রয়টার্সের
আলোচনা ফলপ্রসূ : পুতিন
গতকাল জেনেভার ভিলা লা গেরেঞ্জায় প্রেসিডেন্ট বাইডেন ও প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক হয়। বৈঠকের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে আসেন প্রেসিডেন্ট পুতিন। ৬৮ বছর বয়সি পুতিন ৭৮ বছর বয়সি বাইডেনকে অভিজ্ঞ ও গঠনমূলক রাষ্ট্রনায়ক বলে সম্বোধন করেন। বাইডেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন বলেও পুতিন উল্লেখ করেন। প্রেসিডেন্ট পুতিন জানান, বৈঠক বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না, তবে দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক আলোচনা হয়েছে। পুতিন দাবি করেন, বাইডেনের সঙ্গে বৈঠক খুবই গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ হয়েছে। তিনি বলেন, দুই পক্ষই বহিষ্কৃত কূটনীতিদের পুনরায় ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে সম্মত হয়েছেন।
ন্যাটো জোটে ইউক্রেনের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে পুতিন বলেন, এ ব্যাপারে রাশিয়ার বলার কিছু নেই। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাইবার হামলার বিষয়ে পুতিন বলেন, ক্রেমলিন এ ব্যাপারে ওয়াশিংটনকে তথ্য-উপাত্ত দিয়েছে। তার মতে, সাইবার নিরাপত্তা উভয় দেশের জন্যই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যাপারে দুই পক্ষ আলোচনা করার অঙ্গীকার করেছে।
রাশিয়ার বিরোধী নেতা অ্যালেক্সেই নাভালনিকে আটক রাখার বিষয়ে পুতিন বলেন, এ ব্যাপারে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন হয়নি। ঐ ব্যক্তি জানতেন তিনি রাশিয়ার বিদ্যমান আইন লঙ্ঘন করেছেন এবং বারবার করেছেন। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল। তারপরও তিনি দেশে ফিরেছেন এবং স্বেচ্ছায় আটক হয়েছেন। তিনি যা চেয়েছিলেন তাই-ই হয়েছে।
বাইডেনের প্রশংসা করলেও যুক্তরাষ্ট্রে আগ্নেয়াস্ত্রের সহিংসতার সমালোচনা করে পুতিন বলেন, আমাদের দেশে যাই হোক না কেন আমরা নেতারাই দায়ী। দেখুন, যুক্তরাষ্ট্রে এখন প্রতিদিন মানুষ খুন হচ্ছে। তিনি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর গোপন কারাগারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, পরমাণু অস্ত্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার দায়িত্ব উভয় দেশের। পুতিন জানান, বাইডেন তাকে হোয়াইট হাউজে আমন্ত্রণ জানাননি। আর তিনিও বাইডেনকে মস্কো সফরের আমন্ত্রণ জানাননি।
বৈঠকে মার্কিন রুশ কারাগারে বন্দি মার্কিন নাগরিকদের প্রত্যর্পণের বিষয়টি উত্থাপন করেন বাইডেন। বন্দি বিনিময়ের ব্যাপারে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতা হতে পারে বলে জানান পুতিন। আপনি কোনো রাজনৈতিক লড়াই চান কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে পুতিন বলেন, মার্কিন ক্যাপিটলে ৬ জানুয়ারি যে ঘটনা ঘটেছে রাশিয়া চায় না তাদের দেশে এমনটা হোক। রাজনৈতিক দাবিতে মানুষ মার্কিন কংগ্রেসে দাঙ্গা করেছে। এখন তারা ২০ থেকে ২৫ বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে পারে। কিন্তু কেন আমরা কখনোই বুঝি না। বৈঠকে কে জিতেছে এমন প্রশ্নের উত্তরে পুতিন বলেন, আমরা খুবই খোলামেলা ও আন্তরিক পরিবেশে কথা বলেছি। এটা কোনো প্রতিযোগিতা নয়। খুবই ফলপ্রসূ বৈঠক। প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সঙ্গে আলোচনায় পারস্পরিক আস্থার আলো ছিল বলে পুতিন জানান।
বৈঠকের পর যা বললেন বাইডেন
পুতিনের পর সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেন, আমি প্রেসিডেন্ট পুতিনকে আমার এজেন্ডা জানিয়েছি। এটি রাশিয়া বা কারোর বিরুদ্ধে নয়, এটি আমেরিকার জনগণের জন্য। আমেরিকান হিসেবে সব সময় মানবাধিকারের বিষয়টি আলোচনার টেবিলে থাকবে। তিনি মূলত সৌহার্দমূলক মনোভাব দেখিয়েছেন। বাইডেন বলেন, পুতিন জানেন যে পরবর্তী সময়ে মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপ বা সাইবার হামলা চালালে পরিণতি কী হতে পারে।
কেন পুতিনের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের প্রয়োজন হলো এমন প্রশ্নের জবাবে বাইডেন বলেন, আমি যা বলতে চাই তা যেন সঠিকভাবে পুতিনের কাছে পৌঁছায় এবং আমার বক্তব্যের যেন কোনো ভুল ব্যাখ্যা না আসে সেজন্যই সরাসরি বৈঠক করে পুতিনকে জানিয়েছি। আমি আমাদের মূল্যবোধ এবং অগ্রাধিকারগুলো পুতিনের কাছে সরাসরি উপস্থাপন করেছি। দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলো নিয়েও কথা বলেছি যার মাধ্যমে বিশ্বও লাভবান হতে পারে। তিনি বলেন, আমি পুতিনের সঙ্গে তাই বলেছি যা আমি করতে এসেছি। বাইডেন আরো বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের মতপার্থক্য আছে। কিন্তু কেন এবং সেগুলো কী সেটা আমি পুতিনকে বলেছি। আমি যা করছি তা কেন করছি সেই বিষয়টিও পুতিনকে জানিয়েছি। আমেরিকার স্বার্থে আঘাত আসলে আমরা কেমন প্রতিক্রিয়া জানাব তাও পুতিনকে জানালাম। তারা খুব ভালো সময় কাটিয়েছেন উল্লেখ করে বাইডেন বলেন, আমি পুতিনের কাছে তালিকা দিয়েছি যাতে কোনোভাবেই এসব প্রতিষ্ঠানে সাইবার হামলার ঘটনা না ঘটে। তালিকায় জ্বালানি থেকে পানি খাতও রয়েছে। বাইডেন বলেন, আমি মনে করি না যে পুতিন ঠান্ডা যুদ্ধ চান। পুতিনের সঙ্গে নিজের বয়সের ১০ প্রজন্ম পার্থক্য বলেও বাইডেন বৈঠকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রকে সাইবার সক্ষমতায় ৬০-এর দশকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়াটা ঠিক হবে না বলে পুতিনকে মনে করিয়ে দিয়েছেন বাইডেন। তিনি রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপারে আশাবাদী বলে জানিয়েছেন।
