বিপদ ইউরোপের একার নহে

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:২৪

চরমপন্থা ও জাতীয়তাবাদের পরিণতি কী হইতে পারে—তাহার ব্যাপারে ইউরোপের চাইতে ভালো আর কে জানে? ইউরোপীয় ইউনিয়ন যেই টেকসই শান্তি অর্জন করিয়াছে, তাহা শতাব্দীকাল আগেও অসম্ভব বলিয়া মনে করা হইত। তবে কিছুদিন পূর্বে বিবিসির ‘ক্রসিং ডিভাইডস’ শীর্ষক এক জরিপে দেখা গিয়াছে, অনেক ইউরোপিয়ান মনে করিতেছেন তাহাদের দেশগুলিতে এখন যেভাবে বিভক্তি দানা বাঁধিতেছে, দশ বত্সর আগেও তেমনটি দেখা যাইত না। ইউরোপীয় সমাজের সহনশীলতাও অনেক কমিয়া গিয়াছে বলিয়া মনে করিতেছেন ৪৭ শতাংশ মানুষ। জরিপের হিসাব অনুযায়ী, ইউরোপের ২৭টি দেশের ৬৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন তাহারা ‘জাতিগতভাবে অনেক বেশি বিভক্ত’।

ইহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, পৃথিবীতে এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রয়োজনীয়তা পূর্বের যেকোনো সময়ের চাইতে অনেক বেশি। কিন্তু ইউরোপের তলদেশ দিয়া চোরাস্রোতের মতো বহিয়া চলিতেছে বিচ্ছিন্নতাবাদ, সুরক্ষাবাদ, জাতীয়তাবাদসহ বিবিধ ধরনের চরমপন্থা। সমপ্রতি ইউরোপে জনতুষ্টিবাদের উত্থানের বিষয়ে সতর্ক করিয়া ২১টি দেশের ৩০ জন নোবেলজয়ী লেখক, ইতিহাসবিদ ও বুদ্ধিজীবী এক যৌথ বিবৃতিতে বলিয়াছেন, চিন্তার ধারক ইউরোপ আমাদের চোখের সম্মুখে বিভক্ত হইয়া যাইতেছে। ইউরোপে উদারবাদী মূল্যবোধ গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকের পর হইতে এইবার সবচাইতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়িয়াছে। যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন হইতে বাহির হইয়া যাইবার ব্রেক্সিট এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংসদীয় নির্বাচনে জাতীয়তাবাদীদের উত্থানের কারণে তৈরি হইয়াছে এই চ্যালেঞ্জ। উল্লেখ্য যে, এই বত্সর ২৯ মার্চ ব্রেক্সিট সম্পন্ন হইবার তারিখ নির্ধারিত রহিয়াছে। অন্যদিকে আগামী ২৩ মে হইতে ২৬ মে অবধি অনুষ্ঠিত হইবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংসদীয় নির্বাচন। ইউরোপ সংশ্লিষ্ট বড় এই দুই ঘটনাকে সম্মুখে রাখিয়া ওই বিবৃতি দেওয়া হইয়াছে, যাহা তৈরি করেন ফরাসি দার্শনিক বার্নার্ড হেনরি লেভি এবং সহমত পোষণ করেন ঔপন্যাসিক ইয়ান ম্যাকওয়ান ও সালমান রুশদি, ইতিহাসবিদ সাইমন শামা এবং নোবেল পুরস্কারজয়ী সভেতলানা অ্যালেক্সিভিচ, হেরটা মুলার, ওরহান পামুক ও এলফ্রিডে জেলিনেক প্রমুখ।

আধুনিক বিশ্বের মানবিক ধ্যানধারণা বিকশিত হইবার সবচাইতে উর্বর ক্ষেত্র হইল ইউরোপ। ইউরোপ যেমন অতীতে নৃশংসতার চূড়ান্ত উদাহরণ তৈরি করিয়াছে, তেমনি কল্যাণকর রাষ্ট্রব্যবস্থার অপূর্ব উদাহরণও তৈরি করিতে পারিয়াছে এই মহাদেশ। ইউরোপের ঐতিহাসিক সফলতার মধ্য দিয়াই যাবতীয় চিন্তাধারা ও মানবিক মূল্যবোধের সুরক্ষা দেওয়ার কাজটি সহজ হইয়াছে। বিশ্বব্যাপী মানবতার ক্ষেত্রে ইহা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখন যদি জনতুষ্টিবাদের জোয়ারে ভাসিয়া যায় ইউরোপ, তবে তাহার বিপদ কেবল ইউরোপের একার নহে, তাহা হইবে সমগ্র বিশ্বের।

ইউরোপের বর্তমান সময়ের দার্শনিক আর বিশ্বখ্যাত লেখকরা মনে করিতেছেন, গত ৭০ বত্সরের মধ্যে ইউরোপ এখন সবচাইতে বেশি বিপদে রহিয়াছে বিধায় নূতন কল্যাণকর ঐক্যে পৌঁছানোর এখনই সময়। কিন্তু এই সকল গুণীজনের কথা কি শেষাবধি পৌঁছাইবে ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের কানে? ইউরোপের জনসমাজ কি তাহা উপলব্ধি করিতে পারিবে আরো বড় ধরনের বিপদ ঘনাইবার আগেই? ইহার উত্তর বলিয়া দিবে আগামী সময়।