জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন চলমান। ২০২১-২০২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা চলছে। তবে সংসদে প্রায় প্রতিদিনই বাজেট বিশ্লেষণ কিংবা এর ওপর সংশোধনী-সুপারিশ প্রস্তাবের পরিবর্তে প্রাধান্য পাচ্ছে অন্যান্য ইস্যু। গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদ উত্তপ্ত হয়েছে ক্লাব, মদ, জুয়া, ডিজে (ডিস্ক জকি) পার্টি, টিকটক ও ক্লাব-কেন্দ্রিক ঘটনায় বর্তমানে আলোচিত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী পরীমনিকে নিয়ে। সরকারি কর্মকর্তারা কীভাবে এসব ক্লাবের সদস্য হন, এত টাকা তারা কোথায় পান, এসব ক্লাবে যে পরিমাণ মদ বিক্রি হয় সেটি কতটা বৈধ—এসব প্রশ্নও এসেছে আলোচক এমপিদের কথায়। গত তিন দিন ধরেই সংসদে পরীমনি ইস্যুতে কথা হয়েছে।
গত ২ জুন শুরু হয়েছে চলতি একাদশ জাতীয় সংসদের এই ত্রয়োদশ অধিবেশন, যা বর্তমান সংসদের তৃতীয় বাজেট অধিবেশন। ৩ জুন সংসদে ২০২১-২০২২ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। দুই দিন বিরতির পর ৬ জুন শুরু হয় ২০২০-২১ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনা। পরদিন ৭ জুন ২০২০-২১ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট পাশ হয়। এরপর টানা ছয় দিন বিরতির পর সংসদ আবার শুরু হয় গত সোমবার। এদিন থেকে শুরু হয়েছে নতুন বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা। গত তিন কার্যদিবসে পরীমনি এবং ক্লাব, মদ, জুয়া ও ডিজে পার্টি ইস্যুতে সংসদ তপ্ত হলেও এর আগের তিন কার্যদিবসে (৬, ৭ ও ১৪ জুন) সংসদে আলোচনায় প্রাধান্য পায় বিদেশে টাকা পাচার এবং পুঁজিবাজার, আর্থিক ও স্বাস্থ্য খাতের নানা অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার বিষয়।
জাতীয় সংসদের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’ নামে পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রতিবেদনও প্রকাশ করে সংস্থাটি। দেশের আইনসভায় আলোচনার বর্তমান বিষয়বস্তু ও এর ফোকাস সম্পর্কে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘বাজেট অধিবেশন হলেও সংসদে যেসব ইস্যুতে কথা হচ্ছে, তাতে এটা প্রতীয়মান হয় যে সংসদ সদস্যদের বিবেচনায় বাজেট প্রাধান্য পাচ্ছে না। এমপিরা বাজেটকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। সেজন্য তাদের আলোচনায় অন্যান্য প্রসঙ্গ উঠে আসছে। সমাজে বা রাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া সমসাময়িক জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সংসদে আলোচনা-সমালোচনা হতে পারে, তবে সেটি বাজেটকে ছাপিয়ে মূল আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে না। এটা বাজেট অধিবেশনের মর্মার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরো বলেন, ‘আমাদের (টিআইবির) ধারণা বা গবেষণায় যেটা দেখা গেছে সেটি হলো, বাজেট নিয়ে অনেক এমপিরই আগ্রহ কম। বাজেটের ওপর আলোচনার জন্য বাস্তবে যে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও ধ্যান-ধারণা থাকা দরকার তা অনেকেরই নেই, যার কারণে বাজেটের ওপর আলোচনার জন্য সংসদে দাঁড়িয়ে তারা অন্য ইস্যুতে চলে যান।’
গতকাল সংসদের বৈঠকের শুরুতে পয়েন্ট অব অর্ডার বা অনির্ধারিত আলোচনায় হঠাত্ কিছু সময়ের জন্য সংসদ সরব হয়ে ওঠে পরীমনি এবং ক্লাব, মদ, জুয়া ও ডিজে পার্টি ইস্যুতে। এই অনির্ধারিত আলোচনায় সরকারি দল আওয়ামী লীগ, বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা), বিএনপি ও তরিকত ফেডারেশনের পাঁচ জন সংসদ সদস্য অংশ নেন। সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ সময় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন।
ক্লাবগুলোতে মদ বিক্রি ও জুয়া খেলা হয়, গুলশান-বারিধারায় চলে ডিজে পার্টি :চুন্নু
বৈঠকের শুরুতে অনির্ধারিত ঐ আলোচনার সূত্রপাত করেন জাপার কো-চেয়ারম্যান মুজিবুল হক চুন্নু। তিনি বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে একজন চিত্রনায়িকার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। যেখানে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটা বোট ক্লাব। কে করল এই ক্লাব? এই ক্লাবের সদস্য কারা হয়? শুনেছি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা দিয়ে এ ক্লাবের সদস্য হতে হয়। এত টাকা দিয়ে কারা ক্লাবের সদস্য হন? আমরা তো ভাবতেই পারি না।’
রাজধানীর কয়েকটি ক্লাবের নাম ধরে জাপার এমপি চুন্নু বলেন, এসব ক্লাবে মদ খাওয়া হয়। জুয়া খেলা হয়। বাংলাদেশে মদ খেতে হলে লাইসেন্স লাগে। সেখানে গ্যালন-গ্যালন মদ বিক্রি হয়। লাইসেন্স নিয়ে খেতে হলে এত মদ তো বিক্রি হওয়ার কথা নয়। প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তারা কীভাবে এসব ক্লাবের সদস্য হন? এত টাকা কোথা থেকে আসে? মুজিবুল হক চুন্নু আরো বলেন, গুলশান-বারিধারা এলাকায় ডিজে পার্টি হয়। সেখানে ড্যান্স হয়। নেশা করা হয়। মদ খাওয়া হয়। এসব আমাদের আইনে নেই, সংস্কৃতিতে নেই, ধর্মে নেই। প্রধানমন্ত্রীকে বলব, আপনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দিন, কেন এসব হচ্ছে? কেন এগুলো বন্ধ করা হবে না? ঐ সব ক্লাবের সদস্য কারা হয়?
জিয়া স্টিমার ক্লাব করেছিলেন, লাকী খানের নাচের কথা কি ভুলে গেলেন: শেখ সেলিম
জাপার চুন্নুর বক্তব্যের পর ফ্লোর নিয়ে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, এ তো বোট ক্লাব। জিয়াউর রহমান স্টিমার ক্লাব করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু মদ-জুয়ার লাইসেন্স বন্ধ করে দিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান আবার দিয়েছিলেন। হিজবুল বাহার করেছিলেন। যারা অপরাধের শুরু করেছেন, তাদের আগে বিচার করা উচিত। ওখান থেকে ধরতে হবে।
বিএনপির এমপি হারুনুর রশিদের বক্তব্যের পর আবার ফ্লোর নিয়ে শেখ সেলিম বলেন, ‘লাকী খানের নাচের কথা কি ভুলে গেলেন? হিজবুল বাহার? জিয়াউর রহমান এগুলো করেছিলেন। এসবের জন্য বিএনপি দায়ী। সত্যকে স্বীকার করে নিতে হবে। সরকার কোনো মুসলমানকে মদের পারমিশন দেয়নি। এগুলো বন্ধ করতে গেলে আপনারাই (বিএনপি) চিল্লাচিল্লি করবেন। বলবেন, ফরেনারদের পারমিশন লাগবে।’
চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, সব থানার পুলিশ এসব ক্লাব থেকে টাকা নেয় :বিএনপির হারুন
শেখ সেলিমের প্রথম দফার বক্তব্যের পর ফ্লোর নিয়ে বিএনপির এমপি হারুনুর রশিদ বলেন, ‘আমাদের বিরোধী দলের এক সংসদ সদস্য (চুন্নু) একটা বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন। কিন্তু সিনিয়র এক সদস্য (শেখ সেলিম) কোথায় চলে গেলেন! বাংলাদেশে অনেক বিদেশি থাকেন। বিদেশি কূটনীতিক, ডোম ও বিভিন্ন ধর্মের মানুষের জন্য জিয়াউর রহমান মদের বৈধতা দিয়েছিলেন। কেউ যদি প্রমাণ করতে পারেন যে জিয়াউর রহমান মুসলমানদের জন্য মদের লাইসেন্স দিয়েছেন, তাহলে আমি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করব। হারুন আরো বলেন, এসব ক্লাবে মদের ব্যবসার সঙ্গে সরকারি লোক জড়িত। মন্ত্রী-এমপিরা নন, আমি চ্যালেঞ্জ করছি, সব থানার পুলিশ এসব ক্লাব থেকে টাকা নেয়। প্রধানমন্ত্রী কোনো দলের নন, উনি রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী। এসব খুঁজে দেখা হোক। এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
আইনে কোথায় আছে মুসলমানরা মদ খেতে পারবেন না :নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী
দ্বিতীয় দফায় ফ্লোর নিয়ে বিএনপির হারুনের বক্তব্যের জবাব দেন শেখ সেলিম। এরপর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী বলেন, ‘হারুন সাহেবের সদস্যপদ আজই ছেড়ে দেওয়া উচিত। উনি বললেন, জিয়াউর রহমান মুসলমানদের মদ খাওয়ার পারমিশন দেননি। উনি দেখাক, আইনে কোথায় বলা আছে মুসলমানরা মদ খেতে পারবেন না। আইন এখানে এনে দেখাক। পদ ছেড়ে দিক।’
ডাক্তারের কাছ থেকে সার্টিফিকেট নেয়—জীবন বাঁচাতে প্রতিদিন মদ খেতে হবে :রাঙ্গা
পরে এই অনির্ধারিত আলোচনায় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা ফ্লোর নিয়ে বলেন, এখানে রাষ্ট্রীয় কিছু বিষয় আছে। বঙ্গবন্ধু লাইসেন্স দেননি। তারপর আইনটার অপব্যবহার হচ্ছে। একজন চিকিত্সক দিয়ে সার্টিফিকেট নিয়ে নেয়—জীবন বাঁচানোর জন্য প্রতিদিন মদ খেতে হবে। তারপর লাইসেন্স নেওয়া হয়। বিএনপি এই লাইসেন্স দিয়েছিল। এখন কোনো মুসলমান যদি মদ খায়, সেখানে সরকারের কিছু করার নেই। পরীমনির মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া প্রধান আসামি জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য নাসির উদ্দিন মাহমুদের বিষয়ে তিনি বলেন, পরীমনি অভিযোগ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছেন। একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিচার হবে। দোষী হলে শাস্তি হবে। ইসলামিক বক্তা আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনানকে খুঁজে বের করার দাবি জানান রাঙ্গা।
পরীমনি তো অভিনয় করতে জানেন, নাসিরকে মুক্তি দিন :গোলাম কিবরিয়া টিপু
এদিকে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর গতকাল সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে পরীমনির মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া নাসির উদ্দিন মাহমুদের মুক্তি দাবি করেন। টিপু বলেন, ‘গত কয়েক দিন ধরে একজন চিত্রনায়িকা ও আমাদের প্রেসিডিয়াম সদস্যকে নিয়ে ঘটনা দেখছি। নাসির উদ্দিনকে আমি প্রায় ৩৫ বছর ধরে চিনি। প্রায় ছাত্র অবস্থা থেকে চিনি। সে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং সরকারকে খাজনা দেয়। ঐ ক্লাবে যে নায়িকা গিয়েছিলেন, তারা তো অভিনয় করতে জানেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখলাম তাকে কোলে করে একটা গাড়িতে তোলা হচ্ছে। তাদের এই সমস্ত দিকে লক্ষ রেখে আমি সরকারের কাছে আবেদন রাখব, আইন আইনের মতো চলবে। অবিলম্বে নাসির মাহমুদকে যাতে এই ইসের থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। আইন চলবে, তাকে যেন মুক্তি দেওয়া হয়।’
জাপার এমপি টিপু আরো বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখলাম, ঐ নায়িকা গুলশানে একটি ক্লাবে কতগুলো চেয়ার ভাঙছে, প্লেট ভাঙছে, পেপারওয়েট ভাঙছে। ছবিতে দেখলাম, সে যত ওপরে পা তুলে একজনকে আঘাত করল! বঙ্গললনা নারীর শতকরা ৯৮ জনই এটা করতে পারবে না। এই ব্যাপারটা অত্যন্ত স্পর্শকাতর। সরকারের কাছে আশা করব, যাতে ব্যাপারটা ঠিকমতো দেখে।’ টিকটক বন্ধে আইন করার দাবি জানিয়ে গোলাম কিবরিয়া টিপু বলেন, ‘যুবসমাজ এই টিকটক দিয়ে বেহায়াপনা করছে। আমরা ঢাকার বাইরে গেলেও দেখি। কিছু বলতে পারি না। তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। এটা আইন করে বন্ধ করা উচিত।’
