উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ

আপডেট : ১৮ জুন ২০২১, ২০:৩৮

উদ্যোক্তারা হইলেন একটি জাতির অর্থনৈতিক জগতের নায়ক। জাতি তাহাদের জন্যই অপেক্ষা করে, তাহাদেরই হাত ধরিয়া পা বাড়ায় অগ্রগতির পথে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও প্রায়শই বলিয়া থাকেন যে, শুধু চাকুরির পিছনে না ছুটিয়া সরকারি সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগাইয়া নিজেদের স্বাবলম্বী করিয়া তুলিতে হইবে। তিনি কিছুদিন আগে আরো বলিয়াছেন যে, যুবসমাজের জন্য সরকার কর্মসংস্থান ব্যাংক করিয়া দিয়াছে। সেইখান হইতে কোনো জামানত ছাড়াও ঋণ নেওয়া যাইতে পারে। সেই ঋণ লইয়া যে কেহ নিজের পায়ে দাঁড়াইতে পারিবে।

বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যতখানি চাকুরি তৈরির মেশিন, ততখানি উদ্যোক্তা বানাইবার মতো নহে। একই সঙ্গে আমাদের দেশের অধিকাংশ অভিভাবকও চাহেন তাহার সন্তান যেন পড়াশোনা শেষ করিয়া একটি ভালো মানের চাকুরি পায়। অন্যদিকে উদ্যোক্তা উন্নয়নের দিকে সরকার জোর দিলেও আর্থসামাজিক মর্যাদার কথা চিন্তা করিয়া খুব কমসংখ্যক শিক্ষিত যুবকই সেই দিকে ঝুঁকিয়া থাকে। দেখা যায় যে, একজন চাকুরিজীবী সমাজে যেই সম্মান ও মর্যাদা পাইয়া থাকেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কখনই তাহা পান না। ইহা ছাড়াও চাকরিজীবীদের মাস শেষে বেতনের নিশ্চয়তা থাকে কিন্তু একজন উদ্যোক্তাকে প্রথম দিকে অনেক প্রতিবন্ধকতা ও ঝুঁকির মধ্য দিয়া যাইতে হয়। কয়েক বত্সর পূর্বে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে দেখা গিয়াছে, বাংলাদেশে ৯০ শতাংশ ব্যবসায় শুরু করিবার পাঁচ বত্সরের মধ্যেই বন্ধ হইয়া যায়। লিডারশিপ ইন ইন্টারন্যাশনাল ম্যানেজমেন্ট (এলআইএম) নামের একটি আমেরিকান পরামর্শক সংস্থার গবেষণাকৃত ঐ প্রতিবেদনে আরো বলা হইয়াছে, ইহার কয়েকটি কারণও শনাক্ত করা হইয়াছে। সেই কারণসমূহের মধ্যে নবীন উদ্যোক্তাগণের ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা সম্পর্কে ঔদাসীন্য, দক্ষতার অভাব, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি ইত্যাদি। বাস্তবতা হইল, দেশে চার জন তরুণের মধ্যে এক জন বেকার। প্রতি বত্সর যেই পরিমাণ শিক্ষার্থী স্নাতক শেষ করিতেছে সেই তুলনায় কর্মসংস্থানের সুযোগ কম। ইহা ছাড়াও সরকারি ও অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে একটি চাকুরি নিশ্চিত করিতে স্নাতক পাশের পরও একটি নির্দিষ্ট সময় চলিয়া যায় প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে। প্রস্তুতি শেষে সাফল্যের শিকা ছিঁড়িতেছে খুব অল্পসংখ্যক তরুণের। কারণ, ইহারা চাকুরি না পাইয়া প্রবলভাবে হতাশাগ্রস্ত হইয়া পড়েন। এমন তরুণদের সংখ্যা প্রতি বত্সরই বৃদ্ধি পাইতেছে। ইহারা কি পরিবার ও সমাজের নিকট বোঝা হিসাবে চিহ্নিত হইবে? এই জন্য যুবসমাজকে উদ্যোক্তা হিসাবে গড়িয়া তুলিবার বিকল্প নাই। সুতরাং আমাদের যুবসমাজকে যেন আকৃষ্ট করিতে পারি, তাহাদের যেন উত্সাহিত করিতে পারি। একই সঙ্গে আমরা মনে করি, নিজেকে ভালো না বাসিলে সফল উদ্যোক্তা হওয়া যায় না। নিজেকে ঠিকভাবে ভালোবাসিবার যে শক্তি বা প্রেরণা, অভিজ্ঞমহলের অনেকেই বলেন, ইহা প্রকৃতিদত্ত একটি বিষয়। আসলে প্রেরণাটি আত্মগত। যাহার মধ্যে এই প্রেরণা রহিয়াছে, তাহার জন্য শুরুতেই খুব দক্ষতা অপরিহার্য নহে। কাজের মধ্য দিয়াই তিনি দক্ষ হইয়া উঠেন। তিনি শিখিয়া যান কীভাবে প্রতিকূলতা মোকাবিলা করিতে হয়।

যাহাদের এই আত্মগত শক্তি রহিয়াছে, তাহাদের উদ্যোক্তা হইবার পথটিও খুব মসৃণ নহে। বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হইবার পথে এখনো অনেক কাঁটা বিছানো। ক্ষুদ্র-বৃহত্ সকল ধরনের উদ্যোক্তাই খুব অধিক বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ পান না। সরকারপ্রধান আন্তরিক বটে, কিন্তু রাষ্ট্রের অন্তঃস্থ সিস্টেমগুলি যেই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তাহা দূর করিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, একজন উদ্যোক্তা কেবল নিজেকেই রক্ষা করিল না, আরো দশজনের রুটিরুজিরও ব্যবস্থা করিল। তারুণ্যের এই টগবগে সময়টাকে ইতিবাচক কর্মে ব্যাপৃত না করিলে তাহারা বিপথগামী হইয়া পড়ে। ইহার সমাজের জন্য অত্যন্ত অহিতকর। সুতরাং উদ্যোক্তা তৈরির যাবতীয় পরিবেশ অনুকূলে রাখাটা সকলের জন্যই উইন-উইন হইবে।