ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে সামাজিক অপরাধ

আপডেট : ১৮ জুন ২০২১, ২১:১২

বিপ্লব

প্রেম-প্রীতি, স্নেহ, মায়ামমতায় ভরা আমাদের হাজার বছরের বাঙালি সমাজ ব্যবস্থা, সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ, শিল্প, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সভ্যতা আজ সমাজবিরোধী ও অপরাধীদের দ্বারা আক্রান্ত। এ ধরনের সামাজিক অপরাধ আমাদের দেশে আগেও ছিল তবে বর্তমানে এর প্রবণতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি সংঘটিত কয়েকটি সামাজিক অপরাধের ঘটনা এতটাই নির্মম, নিষ্ঠুর ও ভয়ংকর যে দেশের মানুষ আতঙ্কিত না হয়ে পারে না। তিন-চার বছরের কন্যাশিশু থেকে শুরু করে চার সন্তানের জননীও বিকৃত রুচির ধর্ষকদের কাছ থেকে রেহাই পাচ্ছে না। এমনকি ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে অনেক ক্ষেত্রে কন্যাশিশুদের হত্যাও করা হচ্ছে। সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে পরিচিত মানুষ এতটা নির্মম, নিষ্ঠুর, জঘন্য ও বিকৃত রুচির হতে পারে, তা কল্পনাই করা যায় না। সারা দেশে যে সব সামাজিক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, তার খুব কমসংখ্যকই গণমাধ্যমে আসছে। নির্যাতিতদের বেশির ভাগই সমাজের অত্যন্ত দুর্বল শ্রেণির হওয়ায় এবং পারিবারিক ও সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার ভয়ে অনেকেই তা প্রকাশ করতে পারছে না। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অপরাধীরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সাহসও অনেকে পাচ্ছেন না। এমনকি অভিযোগ করলেও প্রতিকারের পরিবর্তে নির্যাতিতদের নানাভাবে হয়রানি বা হেনস্তা হতে হচ্ছে।

সামাজিক ও মানবিক মূলবোধের চরম অবক্ষয়ই এ ধরনের নিষ্ঠুর অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির মূল কারণ। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অপরাজনীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিশৃঙ্খল শিক্ষাব্যবস্থা ইত্যাদি সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহারও এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে বিকৃত মানসিকতার জন্ম দিচ্ছে। ইন্টারনেটের সহজ প্রাপ্যতা ও অপব্যবহার সামাজিক অপরাধ সংঘটনে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করছে। সমাজের সম্ভ্রান্ত, শিক্ষিত, বিত্তশালী পরিবারের সন্তান এবং  রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও ধর্ষণ, হত্যাসহ ভয়ংকর অপরাধের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। প্রশাসন এমনকি সাধারণ মানুষও এদের ভয়ংকর অপকর্ম সম্পর্কে অবগত রয়েছে। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে কোনো এক অদৃশ্য কারণে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না।

একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক সভ্য সমাজে এ অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্পরতা বাড়ালেই এ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। এ সব অপরাধের বিরুদ্ধে দেশের সব রাজনৈতিক দল ও সংগঠনকে এগিয়ে আসতে হবে এবং জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। শুধু অপরাধীদেরই নয়, তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে। মনে রাখতে হবে পারিবারিক শিক্ষাই শিশু, কিশোর ও তরুণদের জীবনে সরচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করে থাকে। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই শিশু, কিশোর ও তরুণরা সামাজিক, মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা পেয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে বেশির ভাগ পরিবার সন্তানকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে সম্পদশালী হিসেবে গড়ে তুলতেই বেশি আগ্রহী। অন্যদিকে বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দেশের তরুণ সমাজ মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষার পরিবর্তে শুধু পাশ করা শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে। এছাড়া দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অভাব, নীতি ও আদর্শবান নেতার অভাব, যুবসমাজকে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি থেকে দূরে রাখা ইত্যাদি কারণে তরুণ সমাজ বিভ্রান্ত। আমরা আশা করি সরকার এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে সচেতন হতে হবে।

ফরিদপুর