চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রস্তাবিত পানি শোধনাগার প্রকল্পে হালদা নদীর পানি মিলছে না। ফলে মিরসরাই এলাকায় বাস্তবায়নাধীন ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরী পানি সরবরাহ’ প্রকল্পটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের সভায় মত্স্য ও পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সরকারী কয়েকটি সংস্থা থেকে ছাড়পত্র নিতে ওয়াসাকে বলা হয়েছে। তবে এসব সংস্থা আগেই হালদা থেকে পানি নেওয়া যাবে না বলে মতামত জানিয়ে দিয়েছে। ফলে দেশের বৃহত্ এই শিল্পনগরীতে শিল্পকারখানায় প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ প্রকল্পটি অনিশ্চয়তায় পড়েছে। বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরীতে পানি সরবরাহের জন্য চট্টগ্রাম ওয়াসার ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষ প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় হয়ে বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ও মীরসরাই এলাকায় এমনিতে সুপেয় পানির সংকট বিরাজ করছে। শিল্পনগরীর মাস্টারপ্ল্যানে জলাধার নির্মাণ ও পানি শোধনাগার নির্মাণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। শিল্পনগরীর ভেতরে ৫০ একর জায়গা নিয়ে জলাধার করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বৃষ্টির পানি জলাধারে সংরক্ষণ করা হবে। এছাড়া ফেনী ও মুহুরী নদী থেকে পানি নিয়ে পরিশোধনের জন্য দুটি পানি শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ দুটি উত্স থেকে পানি নেওয়া জটিল বিষয়। তার মধ্যে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে ২৫টি নলকূপ বসানোর প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ১৫টি নলকূপ বসানো হয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে তা শিল্পকারখানায় ব্যবহার করা হবে। মিরসরাই ইকোনমিক জোনের প্রকল্প পরিচালক হাফিজুর রহমান বলেন, শিল্পনগরীর পানির চাহিদা মেটাতে প্রকল্পের মাস্টারপ্ল্যানে কয়েকটি অপশন রাখা হয়েছে। কর্ণফুলী ইপিজেডে নির্মিত পানি শোধনাগারে কর্ণফুলী নদী থেকে পানি নিয়ে পরিশোধনের মাধ্যমে শিল্পে পানি ব্যবহার করা হচ্ছে। ঠিক একই প্রক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরীতে সাগর থেকে পানি নিয়ে চাহিদা মেটানো হবে।’
ওয়াসার প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, মিরসরাইয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নগরীতে ২০৪০ সাল নাগাদ দৈনিক ৯১ কোটি লিটার পানির প্রয়োজন হবে। চট্টগ্রাম ওয়াসা দৈনিক ৯ কোটি লিটার পানি সরবরাহের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এই প্রকল্পের পানির উত্স নির্ধারণ করা হয়েছে হালদা নদী। কিন্তু দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মত্স্য প্রজনন কেন্দ্র হালদা থেকে পানি উত্তোলনে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো আপত্তি তুলেছে। এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরীর পরিচালক নুরুল্লাহ নুরী ইত্তেফাককে বলেন, ‘ওয়াসা হালদা থেকে বর্তমানে দুটি প্রকল্পের জন্য দৈনিক ১৮ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করছে। এই অবস্থায় যদি আরো পানি উত্তোলন করা হয়, তাহলে হালদায় মত্স্য প্রজনন হুমকির মুখে পড়বে। ইতিমধ্যে আমরা আপত্তি জানিয়ে দিয়েছি। এখন বৃষ্টিপাত কম হচ্ছে। কাপ্তাই লেক থেকে পানি ছাড়া হচ্ছে না। কর্ণফুলী নদী থেকে লবণাক্ত পানি হালদার অনেক ভেতরে ঢুকে পাড়ছে।’
এদিকে ফেনী ও মুহুরী নদীকে পানির উত্স করা নিয়ে সমস্যা রয়েছে। ওয়াসার প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, ফেনী ও মুহুরী নদী থেকে সব সময় পানি নেওয়া সম্ভব না-ও হতে পারে। এসব নদীর উত্সস্থল ভারতে। ফলে ভারত কোনো কারণে পানি বন্ধ রাখলে পানি শোধনাগার প্রকল্প হুমকির মুখে পাড়বে। আর মেঘনা নদী থেকে পানি নিয়ে পানি শোধনাগার নির্মাণের যে প্রস্তাব করা হচ্ছে, সে বিষয় নিয়ে কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই হয়নি। এটি অনেক দুরূহ ব্যাপার।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম ইত্তেফাককে বলেন, ‘প্রকল্প নিয়ে গত ৬ জুন পরিকল্পনা কমিশনে মিটিং হয়েছে। মিটিংয়ে হালদার পানি ব্যবহার নিয়ে কয়েকটি পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর, মত্স্য মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, নদী কমিশনসহ কয়েকটি সংস্থার মতামত নিতে বলা হয়েছে। এখন আমরা তাদের মতামতের জন্য চিঠি পাঠাব।’
