করোনা মহামারির জন্য এক বছরেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ আছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ভীষণ অস্থিরতা ও হতাশা। অন্যদিকে সেশনজটের পাশাপাশি কর্মসংস্থানে প্রবেশেও দেখা দিয়েছে অনিশ্চিয়তা। করোনাকালীন সারা দেশে বহু শিক্ষার্থী আত্মাহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। গত কয়েক দিন আগে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই মেধাবী শিক্ষার্থীর অকাল মৃত্যু কেউই মেনে নিতে পারছেন না। এভাবে আর কত জনকে জীবন দিতে হবে? কে তাদের মৃত্যুর দায় নেবে? এ নিয়ে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মো. জামিন আহমদ
আত্মহত্যা কোনো সমাধান হতে পারে না
বৈশ্বিক মহামারির শুরু হওয়ার পর থেকে মানুষের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বেড়েছে। অনেক দিন ধরে লেখাপড়ার বন্ধ। তাই শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক সমস্যা বেড়েই চলেছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে দেশের ৭৬ শতাংশ শিক্ষার্থীই মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্ত। আর এই হতাশাই তাদের আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো—আমাদের বেশির ভাগ অভিভাবক এ বিষয়ে তেমন একটা খোঁজ খবর রাখেন না। অন্যদিকে বাংলাদেশের মতো দেশে মনোবিজ্ঞানীদের সংখ্যা খুবই কম। সুতরাং সরকারকে এ বিষয়ে নজর দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসেন। সংসারের হাল ধরার জন্য রয়েছে পারিবারিক চাপ। আবার করোনার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চাকরির বাজারে মন্দা দেখা দিয়েছে। এ থেকে মুক্তির জন্য অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। অথচ আত্মহত্যা মুক্তির পথ নয়। সরকারকে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা ভাবতে হবে। সেইসঙ্গে সীমিত পরিসরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। তা না হলে, ভবিষ্যতে আমাদের কঠিন মাশুল দিতে হবে।
—তানজিল আরিফিন ফয়সাল
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
আত্মহত্যার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে
প্রতি বছরই আমাদের দেশে আত্মহত্যা ঘটনা কম বেশি ঘটে থাকে। এক জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সি মানুষের মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণের মধ্যে আত্মহত্যা অন্যতম। তবে, করোনাকালীন শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। আত্মহত্যার প্রবণতা তরুণদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দিনদিন বেড়েই চলেছে। প্রতিটি শিক্ষার্থী তাদের জীবন ও নিজের অস্তিত্ব ঢিকিয়ে রাখার জন্য কঠিন স্ট্রেসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা চিন্তা করে কোনো ধরনের নিয়োগ পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। এতে করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম হতাশা, উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠা বিরাজ করছে। কাজেই, আত্মহত্যার বিষয়টিকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দিতে হবে। নতুবা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে এর চরম খেসারত দিতে হবে।
—মো. আশরাফুল ইসলাম
রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
মানসিক প্রশান্তি চাই
মানুষের কাছে তার জীবন অনেক দামি। মানুষ নিজেকে বাঁচানোর জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাচ্ছে অর্থাত্ নির্ধারিত সময়সীমা থেকে ১ সেকেন্ড বেশি কে না বাঁচতে চায়? দুঃখের বিষয় সেই মানুষই আত্মহত্যার মাধ্যমে শুধু নিজেকেই নয়, পরিবার এবং রাষ্ট্রকে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই যে একেক সময় মানুষের একেক রকম মনোভাব সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটি আজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আত্মহত্যা নামক অস্ত্রের মাধ্যমে। তার কারণ হলো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এই দীর্ঘ ছুটির ফলে সৃষ্ট হতাশা, মানসিক চাপ, পারিবারিক চাপ, সেশনজট, ক্যারিয়ার গঠনের চাপসহ বিভিন্ন সমস্যা। এগুলো পরিত্রাণের জন্য দরকার একটা সুস্থ ও স্বাভাবিক পরিবেশ যেখানে কোনো হতাশার চাপ থাকবে না। সেজন্য উচিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া উচিত। এছাড়াও মানসিক প্রশান্তির জন্য দরকার হয় মনোবিজ্ঞানীদের সাহায্য। কিন্তু বর্তমানে সেই মনোবিজ্ঞানীদেরই বড্ড অভাব। সুুুুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যথাযথ কাউন্সিলিংয়ের জন্য একজন করে মনোবিজ্ঞানী নিযুক্ত করা হোক।
—ফারহানা ইয়াসমিন
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।
স্বাস্থাবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া উচিত
দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চিয়তার সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাতে অনেকে ভাবছেন শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শুধু পড়ালেখায়। এই দীর্ঘ সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তিলে তিলে যে হতাশা নামক মারাত্মক রোগ সৃষ্টি হয়েছে তা মহামারির চেয়েও মারাত্মক। সাধারণত অন্য যে কোনো রোগের অহরহ চিকিত্সা হয় কিন্তু শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে হতাশা নামক মারাত্মক রোগ বাসা বেঁধেছে তার চিকিত্সা নিশ্চিতে কত জন অভিভাবক দায়িত্ব নেন? যার দরুন অনেকেই জীবনের সমীকরণ মেলাতে না পেরে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়ে নিচ্ছে। গত এক বছরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার মতো যেসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, তার জন্য পরিবারের উদাসীনতা ও দীর্ঘ শিক্ষা বিরতিই প্রধানত দায়ী। শিক্ষার্থীদের এই অকালে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো শিক্ষাব্যবস্থা স্বাভাবিক করা। সেইসঙ্গে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধে পরিবারের সচেতন থাকারও বিকল্প নেই।
—নওশিন ফারহানা তিতলী
আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
