আট দিনে মৃত্যু বেড়ে দ্বিগুণ

আপডেট : ২০ জুন ২০২১, ২২:২৭

করোনা ভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্ট ডেল্টার (ভারতীয়) সামাজিক সংক্রমণ ঘটায় সারাদেশে মৃত্যু গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই বাড়ছে। গত আট দিনের ব্যবধানে মৃত্যু বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। গত ১২ জুন মৃতের সংখ্যা ছিল ৪০ জন। যা  গত ২৪ ঘণ্টায় এসে দাঁড়িয়েছে ৮২ জনে। যা এক দিনের মৃত্যুর হিসাবে গত ৫২ দিনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। গত আট দিনে মোট ৫১৭ জন মারা গেছেন। এরমধ্যে গত ১৯ জুন ৬৭ জন, ১৮ জুন ৫৪ জন, ১৭ জুন ৬৩ জন, ১৬ জুন ৬০ জন, ১৫ জুন ৫০ জন, ১৪ জুন ৫৪ জন এবং ১৩ জুন ৪৭ জন মারা গেছেন। এদিকে রাজধানীতে সংক্রমণ ব্যাপক হারে বাড়ছে। গত সপ্তাহে যেখানে ঢাকায় দৈনিক শনাক্তের হার ছিল ৫ শতাংশ, তা এখন ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে।  গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হওয়া নতুন রোগীদের মধ্যে দুই হাজারই ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগের বাসিন্দা। এই দুই বিভাগ মিলিয়ে গত এক দিনে ২০৬৮ জন কোভিড রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা সারা দেশে মোট শনাক্তের ৫৭ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলছেন, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে লকডাউন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই লকডাউন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। এক্ষেত্রে প্রশাসন চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মানাতে ব্যর্থ হওয়ায় পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। এখন সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর পাশাপাশি সব জেলায় সংক্রমণ বাড়ছে। এখনো সময় আছে, সবার সতর্ক হতে হবে। যেহেতু টিকা পাওয়া অনিশ্চিত, তাই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের একমাত্র ভরসা হলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে মাস্ক পরা, নিয়মিত হাত ধোয়া এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতেই হবে। এক্ষেত্রে সর্বস্তরের জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মসজিদের ইমাম, শিক্ষকসহ সবাইকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এটা দূর করতে হবে। একই সঙ্গে ২০১৮ সালের সংক্রামক আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সত্যিকার অর্থে সক্রিয় থাকলে করোনার এই ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হতো না। করোনা প্রতিরোধে এখন সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

এদিকে ৩ হাজার ৬৪১ জন নতুন রোগী নিয়ে দেশে এ পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৫১ হাজার ৬৬৮ জনে। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ৫৪৮ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এ ভাইরাস। ঢাকা নগরীসহ জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বাধিক ৮২২ জন কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া রাজশাহী জেলায় ৩৭৭ জন, নওগাঁয় ২৩০ জন, খুলনা জেলায় ২২৩ জন, কুষ্টিয়ায় ১৬৪ জন, নাটোরে ১৪৫ জন, চট্টগ্রাম  জেলায় ১৩৬ জন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১০২ জনের মধ্যে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে গত এক দিনে। বিভাগওয়ারি হিসেবে ঢাকায় দৈনিক শনাক্তের সংখ্যা ১৪১১ জন থেকে কমে ১০৪৫ জন এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ৪০১ জন থেকে কমে ২৯৩ জন হয়েছে। কিন্তু রাজশাহীতে ৩৪৫ জন থেকে বেড়ে ১০২৩, খুলনা বিভাগে ৬২৫ জন থেকে বেড়ে ৭৬৩ জন হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যা আগের দিন ১৮ শতাংশের বেশি ছিল। দেশে এ পর্যন্ত মোট শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৯১ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং মৃত্যু হার ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। খুলনা বিভাগে ২৮, ঢাকা বিভাগে ২১ জন ও রাজশাহী বিভাগে ১০ জন মারা গেছেন। এছাড়া মৃতদের মধ্যে ৯ জন চট্টগ্রাম বিভাগের, ৪ জন ময়মনসিংহ বিভাগের, ২ জন সিলেট বিভাগের, ১ জন রংপুর বিভাগের এবং ১ জন বরিশাল বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কী করতে হবে, সেটা আমরা শুধু সুপারিশ করতে পারি। কিন্তু তা বাস্তাবয়ন করবে অন্যান্য প্রশাসন। সামনে কোরবানি ঈদ উপলক্ষ্যে করণীয় কী সেই সুপারিশ আগামী দুই একদিনের মধ্যে আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পৌঁছে দেবো। করোনার টিকা আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে পাওয়া যাবে বলেও তিনি জানান।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মানতে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রয়োজনে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে জেল-জরিমানাসহ যা করা প্রয়োজন তাই করতে হবে।

ঢাকায় করোনা সংক্রমণ দ্বিগুণ বেড়েছে জানিয়ে স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদের (স্বাচিপ) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এমএ আজিজ বলেন, প্রশাসন লকডাউন ঘোষণা করেও মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে পারেনি। তাই এখন জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে বাধ্য করতে হবে। এক্ষেত্রে স্কুল-কলেজের শিক্ষক ও মসজিদের ইমামদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান বলেন, কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি ঘরের বাইরে গেলে মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে হবে। সকল ধরনের সমাবেশ বন্ধ করতে হবে। এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা সেজন্য কঠোর মনিটরিং থাকতে হবে।

তিনি আরো বলেন, করোনা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ব্যাপক ভিত্তিক টিকা দিতে হবে। এটা হলো স্থায়ী প্রতিরোধ। কিন্তু যেহেতু টিকার সংকট, তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। আর যেসব জেলায় আইসিইউ নেই, সেখানে হাইফ্লো নেজাল ক্যানোলা পাঠানোর পরামর্শ দেন এই চিকিত্সক।