মানব-মস্তিষ্কের বিবর্তন আজো অনেক বড় রহস্য। বিজ্ঞানীরা এর কিছু কিছু জানতে পেরেছেন। সম্প্রতি ইসরায়েলে তেল আভিভ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অধ্যাপক মিকি বেন ডোর ও রান বারফাই চমকে দেওয়ার মতো একটা বিবর্তনের তত্ত্ব প্রকাশ করেছেন। মানব-মস্তিষ্কের আকার ও আয়তন বৃদ্ধির কারণ নাকি বিশালাকৃতি প্রাণীগুলোর লুপ্ত হয়ে যাওয়া। প্রায় ২৫ লক্ষ বছর আগে হোমো গণের উত্পত্তির সময় মানব-মস্তিষ্কের আয়তন ছিল ৬৫০ কিউবিক সেন্টিমিটার (সিসি), যা এখন বেড়ে প্রায় ১৩০০ সিসি। অর্থাত্ সম্পূর্ণ দ্বিগুণ আয়তনে বেড়েছে। জানা গেছে, সেই সময়ে অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর গড় ওজন ছিল ২০০ কিলোগ্রাম। হোমো গণের আবির্ভাবের সঙ্গেই বড় আকৃতির প্রাণীগুলো শিকারে বিলুপ্ত হয়। খাদ্যের প্রয়োজনে কৌশলী পূর্বপুরুষেরা ছোট প্রাণীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ছোট প্রাণীগুলোকে শিকারের সেই তাগিদ থেকেই মানব-মস্তিষ্কের আয়তন বৃদ্ধি শুরু হয়েছিল, যা আজ প্রায় দ্বিগুণ।
মস্তিষ্কের আয়তন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এএসপিএম জিন সক্রিয় হয়। ফক্স পি টু জিনের প্রভাবে শুরু হয় ভাষার প্রকাশ। সেই সঙ্গে একাধিক জিনের প্রকাশ শুরু হওয়ায় মস্তিষ্ক ও মাংসপেশির মেলবন্ধন ঘটে। বিবর্তনের এই ধাপে সাধারণ যন্ত্রপাতি, অস্ত্র বানাতে শুরু করে মানুষ। সঙ্গে শুরু হয় মানব-রক্তে ক্ষতিকর মুক্ত মৌলের নিষ্ক্রিয়করণ প্রক্রিয়া। জিনের হারানো ও নতুন জিনের আবির্ভাবে বদলে গিয়েছে রক্তেরও উপাদান। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হল রক্তে মুক্ত মৌলের নিষ্ক্রিয়করণ। মানব-রক্তে মুক্ত মৌলের প্রধান নিয়ন্ত্রক হল ইউরিক অ্যাসিড। ইউওএক্স জিনের অনুপস্থিতির কারণে এপ বা বাঁদর শ্রেণির প্রাণীদের রক্তে ইউরিয়ার পরিমাণ বাঘ, সিংহদের থেকে তিন থেকে দশ গুণ বেশি। ইউওএক্স জিন ইউরিকেস নামক উেসচক সংশ্লেষ করে—যা ইউরিয়া বিপাকে প্রয়োজনীয়। মানুষে অনুপস্থিত ইউরিকেস সক্রিয় থাকলে হয়তো বয়সজনিত গাঁটের বাত থেকে মুক্তি মিলত। ২০১৪ সালে জেমস ক্রটজার অ্যানসেস্ট্রাল জিনোম রিকনস্ট্রাকশন-এর মাধ্যমে দেখালেন যে, প্রায় নয় কোটি বছর আগে এই জিন পূর্ণরূপে কার্যক্ষম ছিল। কিন্তু চার কোটি বছর আগে হঠাত্ এক মিউটেশনের ফলে জিনের কার্যক্ষমতা অনেকটাই কমে যায়। প্রায় দেড় কোটি বছর আগে, অলিগোসিন যুগ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউরিকেস জিন সমপূর্ণ ভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। সেই সময় পৃথিবীতে শুরু হয় ভয়ঙ্কর তুষার যুগ, সাঙ্ঘাতিক ভাবে কমতে শুরু করে খাবারের জোগান। গবেষণায় জানা যায়, শরীরে অধিক ইউরিয়া থাকলে সুগার থেকে ফ্যাটে রূপান্তর সহজেই হয়। সঞ্চিত ফ্যাট এক দিকে প্রাণীগুলোকে ঠান্ডার সঙ্গে লড়তে সাহায্য করে, অপর দিকে বিকল্প পথে ক্যালরি জোগান দেয়। প্রকৃতির চাহিদা মেনেই এই পরিবর্তন স্থায়ী ভাবে নির্বাচিত হয়েছিল।
শুধু ইউরিয়াই নয়, মানব-রক্তে ক্ষতিকর মুক্ত মৌলকে, (যা বয়সের সঙ্গে সঞ্চিত হলে কোষের মৃত্যু হয়) নিষ্ক্রিয় করার জন্য রয়েছে ভিটামিন সি। যদিও ভিটামিন সি সংশ্লেষের প্রয়োজনীয় জিনটিও হারিয়ে গিয়েছে। অ্যাসকরবিক অ্যাসিডের ডাকনাম ভিটামিন সি। গ্লুকোজ থেকে চারটি ধাপে সংশ্লেষিত হয় অ্যাসকরবিক অ্যাসিড, শেষ ধাপে প্রয়োজন ‘গুলো’ নামে একটি উেসচকের। গাছেদের এই উেসচক সক্রিয় থাকলেও, মানুষের নেই। এজন্য আমরা ভিটামিন সি তৈরি করতে পারি না। শুধু আমরা কেন, সমস্ত ড্রাই নোজ প্রাইমেট-সহ গিনিপিগ, এমনকি বাদুড়ও উেসচকের অভাবে ভিটামিন সি তৈরি করতে পারে না। সংগ্রহ করতে হয় প্রকৃতি থেকে। জলে দ্রবণীয় ভিটামিন সি শরীর সঞ্চয় করে রাখতে অক্ষম, অতিরিক্ত ভিটামিন শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। ভিটামিন সি-র অভাবে স্কার্ভি নামে এক মারাত্মক রোগের আগমন হয়।
বিবর্তনের শুরুতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এই জিনটি প্রায় সকল পর্বের প্রাণীর দেহে সক্রিয় ছিল। সম্ভবত ছয় কোটি বছর আগে কোনো এক সময় মিউটেশনের ফলে আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই জিন হঠাত্ই হারিয়ে ফেলেছিল। প্যালিয়োসিন যুগে স্তন্যপায়ী প্রাণীরা লেবুজাতীয় ফলের মাধ্যমে ভিটামিন সি-র অভাব পূরণ করেছিল। তবে এই জিন হারিয়ে মানুষ কি সত্যিই ক্ষতিগ্রস্ত? গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ভিটামিন-সি সংশ্লেষের সময় তৈরি হয় হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, যা ভেঙে মুক্ত ইলেকট্রন কোষের প্রোটিন-সহ ডিএনএ-কে সাঙ্ঘাতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অর্থাত্, ভিটামিন সি তৈরি করতে পারলেও তার মূল্য চোকাতে হতো অনেক বেশি। দেখা যাচ্ছে, বিবর্তনের পথে শুধু নতুন জিন নয়, হারিয়ে যাওয়া জিনগুলোও আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।
—মৃধা রেজাউল
