ভাষা হোক প্রাণবন্ত ও শ্রুতিমধুর

আপডেট : ২১ জুন ২০২১, ২০:৫৫

ভাষা মনের ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। মনের ভাব ইশারা বা আকার-ইঙ্গিতের মাধ্যমেও প্রকাশ করা যায়, তবে মানুষের মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করার সবচেয়ে সহজ ও সাবলীল মাধ্যম হলো ভাষা। ভাষার মূল উপাদান হলো ধ্বনি। ইশারা কিংবা পশুপাখির আওয়াজকে আমরা ভাষা বলতে পারি না। কারণ, সেগুলো অর্থপূর্ণ ধ্বনি না। কোনো ধ্বনিকে ভাষা হতে হলে অবশ্যই সেটি বাগ্যন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত হতে হবে এবং অর্থপূর্ণ ধ্বনি হতে হবে। পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে ৪ হাজারের কাছাকাছি ভাষা আছে। বাংলা ভাষার দুটি রূপ রয়েছে। একটা হলো কথ্য বা মৌখিক আরেকটা হলো লৈখিক রূপ। লৈখিক রূপটি আবার দুটি ভাগে বিভক্ত যথা সাধু এবং চলিত ভাষা। সাধু ভাষা সম্পূর্ণ ব্যাকরণ সিদ্ধ নিয়ম মেনে চলে। তত্সম শব্দে ভরপুর এই ভাষা নাটকের সংলাপের জন্য উপযোগী নয়। সাধু ভাষায় সর্বনাম ও ক্রিয়া পদের পূর্ণরূপ ব্যবহার করা হয়। আগে বাংলা ভাষায় যে সব সাহিত্য রচনা করা হতো সেগুলো সাধু ভাষায় রচনা করা হতো। যার ফলে সেগুলো পড়াটা একটু জটিল বিষয় ছিল। কারণ সেখানে সমাসবদ্ধ শব্দের পূর্ণরূপ ব্যবহার করা হতো। ফলে সঠিক শব্দের সঠিক উচ্চারণ করতে অনেক সমস্যা হতো আর অর্থ বোঝা তো বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল।

বিশ শতকের শুরুর দিকে চলিত ভাষায় সাহিত্যচর্চার সূচনা হয় প্রমথ চৌধুরীর সাপ্তাহিক সবুজপত্র পত্রিকার মাধ্যমে। চলিত ভাষা সাধু ভাষার মতো ব্যাকরণ সিদ্ধ সব নিয়ম মেনে চলে না। চলিত ভাষা সহজ, সরল, সাবলীল একটি ভাষা। চলিত ভাষায় সমাসের সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহার করা হয়। বক্তৃতা বা নাটকের সংলাপ লেখা হয় চলিত ভাষার মাধ্যমে। যার ফলে সেই সংলাপগুলো বুঝতে জনসাধারণের খুব একটা কষ্ট হয় না। চলিত ভাষা সর্বজন গৃহীত মার্জিত একটি ভাষা। বর্তমানে আমরা প্রায় সবাই চলিত ভাষা ব্যবহার করে থাকি। চলিত ভাষা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে থাকে। আমরা সবাই আমাদের নিজেদের কাজের জন্য ভাষার ব্যবহার করে থাকি। ভাষার মাধ্যমে মনের অভিব্যক্তিগুলো অন্যকে প্রকাশ করে থাকি। কিন্তু আমরা অনেকেই ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগের বিষয়টির প্রতি খেয়াল রাখি না। নিজেদের অজান্তেই আমরা এখন ভাষার ভুল প্রয়োগ করে থাকি।

আমাদের লেখার মধ্যে প্রায় সময় আমরা লেখাকে গুরুচণ্ডালী দোষে দূষিত করে ফেলি। একটি লেখার মধ্যে সাধু এবং চলিত ভাষার সংমিশ্রণ ঘটানোর বিষয়টিকে গুরুচণ্ডালী দোষ বলা হয়। এ গুরুচণ্ডালী দোষের কারণে লেখার মধ্যে অর্থের অনেক পরিবর্তন হয়ে যায়। লেখার মধ্যে ছন্দমালার ধরনও পরিবর্তন হয়ে যায়। গুরুচণ্ডালী দোষের পাশাপাশি আবার ভাষার মধ্যে বাহুল্য দোষ, রীতিসিদ্ধ বাক্যে প্রয়োগঘটিত সমস্যাও পরিলক্ষিত হয়। অনেক উচ্চশিক্ষিত সুশীল ভদ্র মানুষের মুখে আজ আমরা অনেক অপশব্দের ব্যবহার শুনতে পাই। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বন্ধুরা একে অন্যকে বার্তা আদান-প্রদানের সময় অনেক ধরনের অপশব্দ ব্যবহার করে থাকে। কেউ কেউ হয়তো জেনে বুঝে করে, আবার কেউ কেউ হয়তো নিজেদের অজান্তেই করে বসে এ ভুলগুলো। শুধু গুরুচণ্ডালী দোষ বা ভাষার মধ্যে অপশব্দ প্রয়োগই নয় বরং সঠিক উচ্চারণ ও সঠিক পদ্ধতিতে বানান লিখতে গিয়েও অনেকে ভুল করে থাকে।

আমরা বাঙালি জাতি, আমাদের মাতৃভাষা এবং রাষ্ট্রভাষা উভয়ই বাংলা ভাষা। তাই আমাদের অবশ্যই বাংলা ভাষা  লেখার প্রতি, বলার প্রতি আরো বেশি যত্নবান হতে হবে। আমরা যদি বাংলা ভাষার অপপ্রয়োগ করি তাহলে সেটি আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে একটি লজ্জাকর বিষয়। তাই আমাদের সবারই উচিত ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগের বিষয়টির দিকে আরো সুনজর দেওয়া। ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ ও সুন্দর সাবলীল চর্চার মাধ্যমেই ভাষা হয়ে ওঠবে আরো প্রাণবন্ত এবং শ্রুতিমধুর।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়