দলকে কিছু না জানিয়ে গোপনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় কুমিল্লা-৫ আসনে (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া) আসন্ন উপনির্বাচনে দল মনোনীত ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের প্রার্থী জসিম উদ্দিনকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। অভিযোগ উঠেছে, টাকার বিনিময়ে দলের অগোচরে ভোটের মাঠ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন জসিম। ফলে উপনির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আবুল হাশেম খান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ২৮ জুলাই এই আসনে ভোট গ্রহণ হওয়ার কথা।
এর আগে একই রকম ঘটনা ঘটে লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর) আসনে। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনে ঐ আসনে জাপার প্রার্থী ছিলেন দশম সংসদের এমপি ও জাপা নেতা মোহাম্মদ নোমান। জাপার সঙ্গে আসন-সমঝোতার ভিত্তিতে এই আসনে দলীয় প্রার্থী দেয়নি আওয়ামী লীগ। তবে ভোটের কয়েক দিন আগে হঠাত্ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান জাপার নোমান। এতে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পথ সুগম হয় ‘আপেল’ প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী শহীদ ইসলাম পাপুলের। ১২ কোটি টাকার খেলায় নোমানের সে সময় ভোটের মাঠ থেকে সরে যাওয়ার ঘটনা দেশ জুড়ে আলোচিত হয়। পরে অর্থ ও মানবপাচারের অপরাধে কুয়েতে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন পাপুল। কুয়েতের আদালতে সাজা হওয়ায় এমপি পদ হারান তিনি। গতকাল সোমবার পাপুলের আসনে উপনির্বাচন হয়েছে। জাপার কেন্দ্রীয় একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, লক্ষ্মীপুরের ঘটনারই অনেকটা পুনরাবৃত্তি ঘটেছে কুমিল্লায়। লেনদেনের বিনিময়েই জসিম দলের অনুমতি ছাড়া প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। কেন্দ্র বিষয়টি জানার পরেই জসিমকে দল থেকে বাদ দিয়েছে।
কুমিল্লা-৫ আসনে উপনির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন আগামী ২৪ জুন। তবে রবিবার বিকালেই জাপার প্রার্থী জসিম জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে হাজির হয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আবেদন জমা দেন। এই আসনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ছিল গত ১৫ জুন। যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ প্রার্থী ছিলেন শুধু আওয়ামী লীগের আবুল হাশেম খান ও জাপার জসিম উদ্দিন। এখন জসিম প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আবেদন করায় হাশেম খান একাই প্রার্থী থাকলেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা জানান, তারা জাপার প্রার্থীর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন পেয়েছেন। যাচাই করে ২৪ জুন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
গতকাল বিকালে জাপার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের দলের গঠনতন্ত্রের ২০/১ (১) (ক) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জসিম উদ্দিনকে দলের প্রাথমিক সদস্যসহ সব পদ-পদবি থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে উপনির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় তার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জাপার সংসদীয় বোর্ড প্রার্থী মনোনয়নের সাক্ষাত্কার অনুষ্ঠানে যে কোনো পরিস্থিতিতে নির্বাচনের শেষ দিন পর্যন্ত নির্বাচনি মাঠে থাকার প্রতিশ্রুতিতে জসিম উদ্দিনকে মনোনয়ন দিয়েছে। জসিম মনোনয়ন বোর্ডের সিদ্ধান্ত অমান্য করেছেন। জাপা শুধু জসিমকে দল থেকে বহিষ্কারই করেনি, এই ঘটনায় একই সঙ্গে দলের কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা কমিটিও বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে।
প্রার্থিতা প্রত্যাহারের বিষয়ে জসিম উদ্দিন গতকাল সন্ধ্যায় টেলিফোনে ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি একা এ সিদ্ধান্ত নিইনি। দলের স্থানীয় নেতারা বসেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আমি তাদের সিদ্ধান্ত মেনেই প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আবেদন জমা দিয়েছি।’ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো টাকা নিইনি। আমি জমিদার পরিবারের সন্তান। আকাশে চাঁদ উঠলে সবাই দেখবে। আর হাশেম খান গরিব মানুষ। তদন্ত করা হোক, আমি কোনো টাকা নিয়েছি কি না। তবে আমাদের স্থানীয় নেতাকর্মীরা যখন আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিল তখন একজন আমাদের নেতাকর্মীদের ৫০ হাজার টাকা দিয়েছে যাতায়াত খরচ বাবদ, তাও তারা এই টাকা নিতে চায়নি।’
এক প্রশ্নের জবাবে জসিম বলেন, ‘হাশেম খানের সঙ্গে আমার একাধিকবার কথা হয়েছে, আলোচনা হয়েছে। তার সঙ্গে কথা বলেই বসে গেছি। এখানে অনেক হিসাব-নিকাষ আছে। তিনি কথা দিয়েছেন আমাদের দেখবেন, আমাদের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করবেন।’ দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বহিষ্কার করেছে, আমি মেনে নিয়েছি। কিন্তু একটা কথা বলব—দলতো শুধু মনোনয়ন দেয়, আমাদের জাপা বলতে কী কিছু আছে? এখানে জাপার কিছু আছে? আমরা কি আওয়ামী লীগের সঙ্গে ফাইট করে ভোটে থাকতে পারব? এসব কিছু বিবেচনা করেই আমি সরে গেছি।’
