দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) প্রতিষ্ঠাতা এবং ‘ইমেরিটাস পাবলিশার’ প্রকাশক মহিউদ্দিন আহমেদ মারা গেছেন। (আন্না লিল্লাহি ... রাজিউন) রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় সোমবার দিবাগত রাত ১টার দিকে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। তার স্ত্রী মেহতাব খানম দেশের প্রখ্যাত মনোবিদ।
মহিউদ্দিন আহমেদের মেয়ে ও ইউপিএলের পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন তার বাবার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। পরে তিনি এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে জানান, ‘বাবা দীর্ঘ ২০ বছর ধরে পারকিনশনস রোগে ভুগছিলেন। কিছুদিন আগে তিনি কোভিডে আক্রান্ত হন এবং সেরে ওঠেন। তারপর আবার হূদেরাগের সমস্যা দেখা দেয়।’
গতকাল মঙ্গলবার বাদ জোহর গুলশানের আজাদ মসজিদে মহিউদ্দিন আহমেদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে বনানী কবরস্থানে সমাহিত হন এই গুণী প্রকাশক। মহিউদ্দিন আহমেদের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শোক জানিয়েছেন জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম।
৯০ দশকের শুরুর দিকে দেশের ইতিহাস সঠিক ও পর্যাপ্তরূপে সংরক্ষণের অভাব অনুধাবন করে ‘রোড টু বাংলাদেশ’ নামে একটি ধারাবাহিক প্রকাশনার সূচনা করেন তিনি। বাংলাদেশের প্রকাশনা জগত্ তার হাত ধরেই আধুনিক হয়ে উঠেছে। দেশে মানুষের পাঠাভ্যাস সৃষ্টিতে এবং বই প্রকাশের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যময় বিষয় পাঠকের সামনে তুলে ধরার কৃতিত্ব তারই। তার মৃত্যুতে দেশের সচেতন পাঠকসমাজ ও লেখক-প্রকাশকদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
মহিউদ্দিন আহমেদের হাত দিয়ে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশিত হয়েছে। ২০১২ সালে মহিউদ্দিন আহমেদ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি বইটি একই সঙ্গে ভারত (পেঙ্গুইন) ও পাকিস্তানে (ওইউপি) ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় প্রকাশ করার ব্যবস্থাও তিনি করেন। ২০১৪ সালে তাকে ‘ইমেরিটাস পাবলিশার’ পদবি প্রদান করে বাংলাদেশ অ্যাকাডেমিক অ্যান্ড ক্রিয়েটিভ পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন।
১৯৪৪ সালে ফেনীর পরশুরামে জন্মগ্রহণ করেন মহিউদ্দিন আহমেদ। তার বাবা ছিলেন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান পোস্টাল সার্ভিসের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। মহিউদ্দিন আহমেদ পড়াশোনা করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায়। পাকিস্তান কাউন্সিল স্কলারশিপ নিয়ে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়েও সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়াশোনা করেন। এমএ পড়া শেষে তিনি পাকিস্তান টাইমসে শিক্ষানবিশ সাংবাদিক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৯ সালে মহিউদ্দিন আহমেদ স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির জন্য আবেদন করেন এবং আর্থিক সহায়তা তথা বৃত্তিসহকারে তা গৃহীত হয়। একই সময়ে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস (ওইউপি)-এর পাকিস্তান শাখায় সম্পাদক পদে নিয়োগ পান। ১৯৭২ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন মহিউদ্দিন। দেশে ফিরে দুই বছর অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের ঢাকা শাখার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের ঢাকা কার্যালয় বন্ধ হয়ে গেলে মহিউদ্দিন আহমেদকে করাচি শাখায় ‘এডিটর-অ্যাট-লার্জ’ বা রোভিং এডিটর হিসেবে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড’ নামের নিজের প্রকাশনা সংস্থা।
গুণী এই প্রকাশকের মৃত্যুতে আরো শোক জানিয়েছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী এবং ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। এছাড়া বাংলা একাডেমি, জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি প্রভৃতি সংগঠন শোক জানিয়েছে।

