উত্তরের জনপদ রংপুরের ছেলে মুহতাসিম আবশাদ জিসান; ছোট থেকে যার বেড়ে ওঠা এক শহুরে জীবনে। স্কুল-কলেজ দুটোই ছিল ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ, রংপুর। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন মানুষের জন্য কিছু করার। সপ্তম শ্রেণি থেকে নিয়মিত রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির সঙ্গে কাজ করতেন জিসান, শুরুটা সেখান থেকেই।
সাহসিকতার সঙ্গে করোনা মোকাবিলায় সম্মুখসারির একজন যোদ্ধা হিসেবে মুহতাসিম আবশাদ জিসানকে ইন্ডিয়ান বুক অব রেকর্ড আয়োজিত ইন্ডিয়ান হিউম্যান টারিয়ান অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। বর্তমানে তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ডিসিপ্লিনে প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত।
২০১৮ সালের ডিসেম্বরে কিছু স্বপ্নবাজ তরুণের হাত ধরে জিসানের নেতৃত্বে পথচলা শুরু হয় ‘চলো স্বপ্ন ছুঁই’ সংগঠনের। ৩০ জন সদস্য নিয়ে চলো স্বপ্ন ছুঁই যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে উত্তরবঙ্গের সাতটি জেলায় সাড়ে চারশতাধিক সদস্য রয়েছে। যাদের ইচ্ছা সমাজের প্রতিটি অসহায় সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। বর্তমানে এসডিজির পাঁচটি প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করে সংগঠনটি।
করোনার শুরু থেকে সংগঠনটির তরুণ সদস্যরা ত্রাণ কার্যক্রম, জীবাণুনাশক স্প্রে, প্রতিষ্ঠান, দোকানপাটের সামনে নিরাপদ দূরত্বের ছক, দেয়াল লিখন, পোস্টারিং, পথচারীদের মাঝে মাস্ক, স্যানিটাইজার, হ্যান্ডওয়াশ বিতরণ করেন।
করোনার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৫০০ পরিবারকে ‘চলো স্বপ্ন ছুঁই’র পক্ষ থেকে খাদ্য ও অর্থ সহায়তা প্রদান করা হয়। এছাড়াও প্রতিবন্ধীদের হুইল চেয়ার প্রদান, কর্মক্ষম মানুষের আয়ের পথ সৃষ্টির জন্য হাঁস-মুরগি, গবাদি পশু, সেলাই মেশিন প্রদানের কাজ করছে চলো স্বপ্ন ছুঁই। করোনাকালে প্রায় ২৭ হাজার মাস্ক বিতরণ করেন তারা। মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিনামূল্যে ক্যাম্পেইন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ, রেস্টুরেন্টের ওয়াশ-রুমে স্যানিটারি ন্যাপকিন বক্স স্থাপন করে দেশ জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে সংগঠনটি।
সাহসিকতার সঙ্গে করোনা মোকাবিলা করার এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ন্যাশনাল করোনা ওয়ারিওর অ্যাওয়ার্ড, হিউম্যান রাইটস নোবেল অ্যাওয়ার্ড-২০২১, ডাব্লিউএসি আইকন অ্যাওয়ার্ড-২০২১, ডাব্লিউএসি স্টার অ্যাওয়ার্ড-২০২১, ইয়ুথ আইকন অ্যাওয়ার্ড, গ্লোবাল হিউম্যানিটি অ্যাওয়ার্ড-২০২১, গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড অব এক্সিলেন্স-২০২১, বেস্ট ইনোভেটিভ আইডিয়া অ্যাওয়ার্ড-২০২১, বেস্ট সোশ্যাল ওয়ার্কার অ্যাওয়ার্ড-২০২১, কভিড-১৯ হিরো অ্যাওয়ার্ড-২০২০ অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছেন। তার কার্যক্রম দিয়ে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের স্বেচ্ছাসেবকদের কার্যক্রম তুলে ধরেছেন।
মুহতাসিম আবশাদ জিসান বলেন, ‘সামাজিকভাবে দায়বদ্ধতা থেকে হলেও আমাদের সবার এসব সামাজিক কর্মকান্ডে এগিয়ে আসা উচিত, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমার কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে পারছি। বহির্বিশ্বে বিভিন্ন প্রজেক্টে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছি। ৯ বছরের স্বেচ্ছাসেবী জীবনে পেয়েছি অনেক সম্মান, অনেক মানুষের দোয়া ও ভালোবাসা। নতুন এই প্রাপ্তি কাজের সপৃহাকে আরও বাড়িয়ে দেবে। সেইসঙ্গে যেসব শুভাকাঙ্ক্ষী আমাদের সব সময় সহযোগিতা করে তাদের প্রতি আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। কারণ তাদের সহযোগিতা ছাড়া আমরা এতটা পথ চলতে পারতাম না।’
তার ভাষ্যমতে, তাদের সংগঠনের সব সদস্যই শিক্ষার্থী। সদস্যদের টিউশন, বৃত্তির টাকায় এর অর্থায়ন হয়। এছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সমাজের বিত্তবানদের অনেকেই আমাদেরকে সহযোগিতা করে থাকেন। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির মানুষের স্বপ্ন পূরণই ‘চলো স্বপ্ন ছুঁই’র লক্ষ্য।
তরুণ এই স্বেচ্ছাসেবক শুধু চলো স্বপ্ন ছুঁই’র মধ্যে সীমাবদ্ধ নন, গড়ে তুলেছেন আরও কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যুক্ত আছেন অনেকগুলো সংগঠনের সঙ্গে। লিও ক্লাব অব দুর্বার বাংলাদেশ, ধ্রুবতারা ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন, ইয়ুথ ফর ক্লাইমেট অ্যাকশন প্রজেক্ট, অ্যাকসেস টু হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল, ভলেন্টিয়ার ফর বাংলাদেশ, ইয়ুথ ক্লাব অব বাংলাদেশসহ আরও অনেকগুলো সংগঠনের সঙ্গে জড়িত এই তরুণ। আপাতত হাতে নেওয়া প্রজেক্টগুলো বাস্তবায়ন করা, তারুণ্যনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন জিসান এবং তার সংগঠন।
ইত্তেফাক/এএইচপি
