পানি বিপর্যয় এবং আল-কোরআন

আপডেট : ২৪ জুন ২০২১, ২১:৫২

সাম্প্রতিক কালে দেশের কয়েকটি জেলায় পানীয় জলের দুষ্প্রাপ্যতা, লবণাক্ততা ও দূষণ মিলে যে অবস্থার তৈরি হয়েছে তাকে পরিবেশের বড় রকমের এক বিপর্যয়ই বলা চলে। ছড়িয়ে পড়েছে ডায়রিয়াসহ নানা রোগ। মৃত্যুসংখ্যা বাড়ছে প্রতিদিন। নদী, পুকুরের পানি হয়ে পড়ছে ব্যবহারের অনুপযোগী। গত মার্চ থেকে বদলে যাচ্ছে এই পানির গুণ, স্বাদ আর লবণ মাত্রা। জলবায়ু পরিবর্তিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। নদীর গভীরতা কমে গিয়ে জোয়ার-ভাটায় তারতম্য হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ উঁচু হচ্ছে আর লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে নিম্নাঞ্চলে। এ বছর বৃষ্টিও হয়েছে অনেক কম। বিপর্যয়ের শিকার শুধু মানুষই নয়, গবাদি পশু, মাছ, জলজ উদ্ভিদ সবকিছুই পড়েছে ঝুঁকিতে। চোখের সামনে তছনছ হচ্ছে বাস্তু সংস্থান। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, পুকুরের পানি দূষিত হওয়া, নলকূপের পানি লবণাক্ত হওয়া এখানেও অসুখের জন্য দায়ী।    

এর পরে আমি যা লিখব সেটা একান্তই আমার ধর্মীয় বিশ্বাস আর অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান থেকে। আমি পবিত্র কোরআনের প্রাসঙ্গিক কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করব। প্রথম আয়াতটি সুরা আল-মুমিনুনের। ‘আর আমরা আকাশ থেকে পরিমাণমতো বৃষ্টি বর্ষণ করি, এরপর একে মাটিতে সংরক্ষণ করি, আর নিশ্চয়ই তাকে আমরা সরিয়ে নিতেও সক্ষম।’ (২৩ :১৮)। বৃষ্টিবহুল এলাকাতেও একসময় অনাবৃষ্টি হানা দিতে পারে। এর ফলাফল যে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরেও পড়বে তা এখন টের পাওয়া যাচ্ছে হাড়ে হাড়ে।

এর পরের তিনটি আয়াত সুরা ওয়াকিয়াহ্ থেকে নেওয়া। নিশ্চিতভাবে এটি আপনাকে আরো ভাবাবে। ‘তোমরা যে পানি পান করো সে সম্বন্ধে ভেবে দেখেছ কি? তোমরা তা মেঘ থেকে নামিয়ে আনো, না আমি তা বর্ষণ করি? আমরা চাইলে তাকে তীব্র লবণাক্ত করে দিতে পারি। তাহলে কেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো না? (৫৬ :৬৮-৭০)। অর্থাত্ স্বাদু পানির আধারগুলো লবণাক্ত হয়ে যাওয়ার সুস্পষ্ট অশনিসংকেত। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, বন পুড়িয়ে ফেলা, সবুজ ধ্বংস করা, খাল ভরাট, নদী দখল, এগুলোও কি অকৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ নয়?

ঢাকায় বসে যারা উপকূলীয় দুর্যোগ, তথা বৈশ্বিক পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে চোখ বন্ধ করে আছেন, সুরা মুল্কের শেষ আয়াতটি তাদের জন্য। ‘তোমরা ভেবে দেখেছ কি, যদি তোমাদের পানীয় জল ভূগর্ভের গভীরে চলে যায়, তবে কে তোমাদের প্রবহমান পানি সরবরাহ করবে?’ (৬৭ :৩০)। আমরা কি আসলেই ভেবে দেখেছি, কী ভয়ংকর দুর্যোগ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য! বসবাসের অযোগ্য এই নগরীতে খুব শিগিগরই আসছে পানির আকাল। এই করোনাকাল আমাদের কিছুটা হলেও চিন্তা করতে শিখিয়েছে কি?

নাকি আমরা মুদ্রার উলটো পিঠটাই শিখে যাব? বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ এখানে বিনিয়োগ করবে সুপেয় জলের রমরমা ব্যবসা করতে। কোনো এক মঙ্গলবার একনেক বৈঠকে পাশ হবে নদীখনন, ভূগর্ভস্থ শেষ জলীয় অণু শুষে নেওয়ার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। প্রকল্প পরিচালক আর প্রকৌশলীদের পরিবার সুইডেন, দুবাই, টরন্টোতে খোঁজ শুরু করবে নতুন বেগমপল্লির। বাজার সয়লাব হবে ভেজাল স্যালাইনে। সুন্দরবনের বুক চিরে তৈরি হবে এশিয়ার সর্ববৃহত্ আমদানিকৃত পানি রাখার জলাধার। তবু আমাদের বলে যেতে হবে পরিবেশ, নদী, সবুজ বাঁচানোর কথা। যার যার অবস্থান থেকে একযোগে প্রস্তুতি নিতে হবে আসন্ন দুর্যোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার।

lলেখক :চিকিত্সক, শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট হাসপাতাল, মাতুয়াইল, ঢাকা