বৃক্ষরোপণ হলো সাদকায়ে জারিয়াহ

আপডেট : ২৪ জুন ২০২১, ২১:৫৩

আমাদের জাতীয় সম্পদগুলোর মধ্যে গাছ অন্যতম। বৃক্ষরোপণ করে যেমনি ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন করা যায়, তেমনি এতে পরিবেশের ভারসাম্যও বজায় থাকে। সবুজ বন-বনানী সুন্দর করে মানুষের মন। শান্তিময় গাছগাছালির হাওয়া ফুরফুরে মেজাজ তৈরি করে। মানবজীবনের সর্বক্ষেত্রে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে গাছের অবদান। গাছ সৌন্দর্যের প্রতীকও বটে। সুন্দর পরিবেশ কিংবা সুন্দর বিশ্ব গাছছাড়া কল্পনাও করা যায় না। পবিত্র কোরআন মাজিদ ও হাদিসে নববিতে বৃক্ষরোপণকে নানাভাবে উত্সাহিত করা হয়েছে। গাছ সম্পর্কে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন—‘এবং তৃণলতা ও বৃক্ষাদি সিজদারত আছে।’ (সুরা আর-রাহমান, আয়াত নম্বর-৬)। অন্য আয়াতে কারিমায় ইরশাদ হয়েছে—‘তোমরা যে বীজ বপন করো সে সম্পর্কে চিন্তা করেছ কি? তোমরা কি একে অঙ্কুরিত করো, না আমি অঙ্কুরিত করি? (সুরা ওয়াকিয়া, আয়াত নম্বর ৬৪-৬৫)। ‘তিনিই আকাশ হতে বারি বর্ষণ করেন। এতে তোমাদের জন্য রয়েছে পানীয় এবং তা থেকে জন্মায় উদ্ভিদ যাতে তোমরা পশু চারণ করে থাকো।’ (সুরা আন-নাহল, আয়াত নম্বর ১০)।

বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব বর্ণনা করে মহানবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন—‘কোনো মুসলমান যদি বৃক্ষরোপণ করে কিংবা কোনো ফসল আবাদ করে, এর পর তা থেকে কোনো পাখি, মানুষ বা চতুষ্পদ জন্তু কিছু ভক্ষণ করে তবে তা তার জন্য সাদকাহ হিসেবে গণ্য হবে।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো ইরশাদ করেন—‘যে ব্যক্তি বৈধভাবে সীমা লঙ্ঘন ব্যতীত কোনো ঘর তৈরি করে অথবা বৈধভাবে সীমা লঙ্ঘন ব্যতীত একটি চারা রোপণ করে,  যত দিন জগত্ তা দিয়ে উপকৃত হবে, তত দিন তার আমলনামায় আল্লাহর পক্ষ থেকে সওয়াব অব্যাহত থাকবে।’

বৃক্ষরোপণের নির্দেশ প্রদান করে মহানবি হজরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন—‘তুমি যদি কিয়ামতের আগমন সম্পর্কে নিশ্চিত হও, সে সময় যদি তোমার হাতে একটি গাছের চারা থাকে যা রোপণ করা যায়, তবে তা তুমি রোপণ করো।’ (সহিহ বুখারি ও মুসনাদে আহমদ)।

প্রিয়নবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে বৃক্ষপ্রেমিক ছিলেন এবং তিনি বৃক্ষ শোভামণ্ডিত পরিবেশ ভালোবাসতেন। সাহাবি হজরত জাবের (রা) বর্ণনা করেন—‘একদা নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে মাবাদ নামক এক ব্যক্তির বাগানে প্রবেশ করেন। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন—হে উম্মে মাবাদ! এ গাছটি কে রোপণ করেছে? (কোনো মুসলমান না কাফির) উত্তরে সে জানাল—মুসলমান। তিনি বললেন—কোনো মুসলমান যদি কোনো গাছ রোপণ করে, আর তা হতে মানুষ কিংবা চতুষ্পদ জন্তু অথবা পাখি ভক্ষণ করে, তবে তা কিয়ামতের দিন পর্যন্ত তার জন্যে সাদকায়ে জারিয়াহ হয়ে থাকবে।’ (সহিহ মুসলিম ও জামি তিরমিজি)।

এ হাদিসের আলোকে আমরা বুঝতে পারি, বৃক্ষরোপণ নিছক সওয়াবের কাজ নয়, বরং তা সাদকায়ে জারিয়াহর অন্তর্ভুক্ত। তাই আমাদের পারলৌকিক সঞ্চয়ের জন্য বৃক্ষরোপণ করা এবং এর পরিচর্যা করা প্রয়োজন। বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব ও ফজিলত বর্ণনার পাশাপাশি আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও বৃক্ষরোপণ করেছেন। সাহাবি হজরত সালমান ফারসি (রা)-এর মালিক যখন তার মুক্তির জন্য ৩০০টি খেজুর চারা রোপণের শর্তারোপ করল, তখন নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শর্তপূরণে নিজ হাতে ৩০০টি চারা রোপণ করেন। (মুসনাদে আহমদ)।

রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, হঠাত্ তার বাহন থেমে গেল। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ দুই কবরে আজাব হচ্ছে। এদের একজন চোগলখোরি করত, অপর জন প্রস্রাব করে পবিত্রতা অর্জনে অবহেলা করত। অতঃপর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাহন থেকে নেমে কবরবাসী দুই ব্যক্তির মাগফিরাতের জন্য দোয়া করলেন এবং কবরদ্বয়ের পাশে দুটি গাছের ডাল রোপণ করলেন। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম ও সুনানে আবু দাউদ)

এ হাদিসের আলোকে অনেক ইসলামি গবেষক মৃত ব্যক্তির কবরের পাশে বৃক্ষরোপণ করা মুস্তাহাব বলেছেন। যেহেতু গাছ মহান আল্লাহ তাআলার তাসবিহ পাঠ করে থাকে, তাই এর সাওয়াব মৃত ব্যক্তি পাবে।

এখন বর্ষাকাল। গাছ লাগানোর উপযুক্ত সময়। তাই এ সময়ে বাড়ির পাশের ফাঁকা জায়গায়, পুকুরপাড়ে, খাল বা নদীর ধারে, রাস্তার পাশে, বাঁধ বা রেললাইনের পাশে, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায়, অফিস-আদালত, ঈদগাহ, কবরস্থানের খালি জায়গায় বৃক্ষরোপণ করে আমরা সবাই ইহকালীন ও পরকালীন উপকার লাভ করতে পারি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে সেই তাওফিক দান করুন। আমিন!

lলেখক :আলেম, প্রাবন্ধিক ও কলেজশিক্ষক