আলো ছড়াচ্ছে 'তারুণ্যের অগ্রদূত'

আপডেট : ২৪ জুন ২০২১, ২১:৫৯

২০১৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা, চাঁদপুর মুক্তিযুদ্ধের বিজয়মেলা মঞ্চে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধারা বক্তব্য রাখছিলেন। তারা বলছিলেন, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে তরুণদেরকেই হাল ধরতে হবে। প্রত্যেকেই দেশের জন্যে কিছু না কিছু করতে হবে। তাদের ব্যক্তব্যে একজন তরুণ ঠিকই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তিনি সেদিনই ঠিক করলেন ভালো কিছু করতে হবে। পরে সেই তরুণ ভিভিয়ান ঘোষ তার বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন সামাজিক সংগঠন 'তারুণ্যের অগ্রদূত'। "তারুণ্যের গর্জন, তারুণ্যের উচ্ছ্বাস বদলে দিবে আমাদের সমাজ" স্লোগান নিয়ে ২০১৪ সালের ১৬ই ডিসেম্বর থেকে যাত্রা শুরু হয় সংগঠনটির।

জেলার বিভিন্ন শিক্ষা  প্রতিষ্ঠানের একদল উদ্যমী তরুণরা সংগঠনের জন্য কাজ শুরু করেন। প্রথমে কিছু বাঁধার সম্মুখীন হলেও পরবর্তীতে তারা তাদের কাজের দ্বারা বেশ প্রশংসিত হয়েছেন। দীর্ঘ ৬ বছরের বেশী সময় ধরে সুবিধাবঞ্চিত শিশু, অসহায় মানুষ ও সমাজের নানা সামাজিক ব্যাধি নিয়ে কাজ করছে সংগঠনটি। সংগঠনের সদস্যদের মাসিক চাঁদা এবং উপদেষ্টাদের অনুদানের অর্থই সংগঠনটির মূল উৎস।

প্রতিষ্ঠার পর শুরুতে শীতার্তদের মাঝে শীত বস্ত্র বিতরণের মধ্যে দিয়ে সূচনা হয় তারুণ্যের যাত্রা। এরপর জাতীয় দিবসগুলো নিজস্বভাবে উদযাপন, সমাজের অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়াস চলতেই থাকে। প্রতিষ্ঠার পর বছরখানেকের মধ্যে 'তারুণ্যের অগ্রদূত স্কুল' নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করা হয়। যেখানে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ছুটির দিনসহ সপ্তাহে ৩ দিন পড়ানো হয়,  ক্লাস শেষে তাদের খাবার দেওয়া হয় এবং বিশেষ দিনে রেস্টুরেন্টে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে স্কুলে ১৩০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।  'স্বপ্ন দেখার ক্লাস' এর মাধ্যমে বাচ্চাদের নাচ, গান, আবৃত্তি ও সুন্দরভাবে কথা বলার কলাকৌশল শেখানো হয়। 'অগ্রদূত উৎসব'-এর মাধ্যমে শিশুদের শিক্ষা উপকরন বিতরন ও দুই ঈদে নতুন পোশাক দেওয়া হয়। সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা নাকি জানেই না তাদের জন্মদিন কবে; তাই একটি বিশেষ তারিখে একসঙ্গে পালিত হয় সবার জন্মদিন। যার নাম 'জন্মোৎসব'।

তাছাড়া এই সংগঠনটি তরুণ প্রজন্মকে জাতীয় দিবস গুলোর তাৎপর্য বোঝানোর চেষ্টা করে। ঈদ উপলক্ষে মাদ্রাসায় খাদ্যসামগ্রী, রান্না করা খাবার, কখনো ছাগল নিয়ে হাজির হয়ে যান এতিমদের সাথে ঈদ পালনে। স্বাবলম্বী করার জন্য সেলাই মেশিন বিতরণ করেন। এছাড়া গত কয়েকবছর বন্যার্তদের মাঝে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও নগদ অর্থ দিয়ে সহায়তা করা হয়। শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষেও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদেরকে নতুন পোশাক দেয়া হয়।

১৬ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সবসময় থাকে ভিন্ন আয়োজন। সেদিনে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা তাদের বিভিন্ন পরিবেশনা উপস্থাপন করে এবং তাদের পুরস্কৃত করা হয়।  ১৬ জন বৃদ্ধ ভিক্ষুককে অনুষ্ঠানের অতিথি করা এবং সবাইকে শাল উপহার দেয়া হয়।  মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে 'ভালোবাসায় বঙ্গবন্ধু' নামে  ভিডিও ডকুমেন্টারি তৈরি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে  প্রদর্শন করা হয় এবং শিক্ষার্থীদের নিয়ে কুইজের আয়োজন করা হয়, যেন নতুন প্রজন্ম বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানতে পারে।

করোনাভাইসের শুরু থেকে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ব্যানার-ফেস্টুন প্রদর্শন, হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং মাস্ক বিতরণ করছে  'তারুণ্যের অগ্রদূত'। অসহায়, নিম্ন আয়ের মানুষ ও গরীব পরিবারকে  নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও নগদ অর্থ দিয়ে সহায়তাও করে এই সংগঠন।  এবছর দু'টি অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনেছেন, কারও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা ও করোনা আক্রান্তদের বিনামূল্যে অক্সিজেন দিয়ে সহায়তা করে যাচ্ছেন তারা। তাছাড়া রক্তদান ও বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়।  

সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ভিভিয়ান ঘোষ বলেন, সুবিধাবঞ্চিত শিশু এবং অসহায় মানুষের মুখের হাসি ফুটানোই সংগঠনের সফলতা। যদিও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সংগঠনের কাজের জন্য অ্যাওয়ার্ড  দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে সন্তানহারা বৃদ্ধদের নিয়ে কাজ করা এবং জেলার প্রতিটি উপজেলায় কাজের পরিকল্পনা চলছে।

ইত্তেফাক/এসটিএম