চটুল গল্প অক্সিজেন

আপডেট : ২৫ জুন ২০২১, ২০:৪৯

স.ম. শামসুল আলম

 

বাসুদেব আর অবন্তির মধ্যে প্রেম জমে উঠেছে। ভার্সিটিতে তারা এখন সবার প্রিয় জুটি। সবাই জানে, ওরা দুজন একে অপরের অক্সিজেন। বাসুদেব একদিন অবন্তির দেখা পায়নি। পরদিন বলেছে, তোকে ছাড়া আমি বাঁচি নাকি? তুই আমার একমাত্র অক্সিজেন।

অবন্তি হেসে বান্ধবী মহুয়ার গায়ে ঢলে পড়ে। মহুয়া হাসতে হাসতে বলে, সুন্দর একটা নাম পেয়ে গেলি অবন্তি। যেটা ছাড়া কোনো মানুষই বাঁচে না।

অবন্তি বলল, বাসুদেবও তো আমার অক্সিজেন। ওকে ছাড়া আমি বেঁচে থাকব নাকি?

সেই থেকে দুজন হয়ে গেল একে অপরের অক্সিজেন। বন্ধুদের অনেকে ওদেরকে অক্সিজেন বলে ডাকতে শুরু করল। এক বন্ধু অন্য বন্ধুর কাছে জানতে চাইল, এই— অক্সিজেনকে দেখেছিস?

কোনটা? লেডিস না জেন্টস?

এমনই অবস্থা হলো। অক্সিজেনও লিঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। কেউ বাসুদেবকে খুঁজতে হলে বলে, পুরুষ অক্সিজেন, আবার কেউ অবন্তিকে খুঁজতে বলে, মহিলা অক্সিজেন। দু বছর এটা নিয়ে হাসি-তামাশা চলল। বাসুদেব আর অবন্তির ভালোবাসা আরো গাঢ় হলো।

দেখতে দেখতে সময় গড়িয়ে গেল। এবার ভার্সিটি ছাড়ার পালা। বন্ধুরা কে কোথায় ছিটকে পড়ল ঠিক নেই। তবু মোবাইলে কারো সাথে কথা হলে অবন্তিকে অক্সিজেন বলতে ভুল করে না কেউ। আবার বাসুদেবের বেলায়ও একই ঘটনা।

বাসুদেব যখন অবন্তির সাথে ইনবক্সে চ্যাট করে, তখনও সম্বোধন আগের মতোই থাকে।

আমার অক্সিজেন, কী করছো এখন?

কিছু না। খেয়ে উঠলাম। তুমি খেয়েছো আমার অক্সিজেন?

তুমি খেলেই আমার খাওয়া হয়ে যাবে। তুমি না আমার অক্সিজেন। আমি না খেয়েও বেঁচে থাকব।

এরপর হা-হা হি-হি হাসির ইমো আদান-প্রদান। ফোনে কথা বলার সময়ও একই অবস্থা। আনন্দ আর ধরে না।

এরপর দুই পরিবারের সম্মতিতে পারিবারিকভাবে দুজনের বিয়ের তারিখ ধার্য হয়। কোভিড-১৯ আর লকডাউনের কারণে তারিখ পিছিয়ে করা হয় ২৬ এপ্রিল ২০২১। দুই মাস ধরে দুই পরিবারে খুশির বন্যা বইছে। কেনাকাটার ধুম চলছে। কিন্তু বিয়ের নির্ধারিত দিনের ৩ দিন আগে বাসুদেব করোনা পজিটিভ। অগত্যা হাসপাতালে ভর্তি। বিয়ে হবে কি হবে না পারিবারিক দ্বন্দ্ব। শেষে অবন্তি বলল, হাসপাতালেই বিয়ে হবে। লগ্নভ্রষ্ট হতে দেয়া যাবে না।

অবন্তির বিশ্বাস, ও বাসুদেবের অক্সিজেন, ফলে যেভাবেই হোক বাসুদেবকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে। যথাসময়ে মাস্ক পড়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসল অবন্তি। মন্ত্রপাঠ হলো। বাসুদেবের সাথে মালাবদলও হলো। তখন ফেসবুকে ভারতের একটি ছবি ভাইরাল হয়ে গেছে। অবন্তি সেটা দেখতে পেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ল। এক দম্পতির করুণ গল্প। স্বামী করোনায় আক্রান্ত হয়ে শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেল। স্ত্রী তাকে হাসপাতালে নেয়ার পথে নিজের মুখ স্বামীর মুখে লাগিয়ে শ্বাস দেয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তির আগেই স্বামী মারা গেল। স্ত্রীর অক্সিজেন কোনো কাজে লাগল না। জীবন দেয়া আর জীবন নেয়া— দুটোই অক্সিজেনের চরিত্র কিনা, অবন্তি চরিত্র চেনার চেষ্টা করতে লাগল।

কিন্তু ঐ মহিলাটি জানত না, মানুষের মুখ থেকে অক্সিজেন নয়, নির্গত হয় কার্বন-ডাই-অক্সাইড। তবু স্বামীর প্রতি ভালোবাসা দেখানোর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো। অবন্তির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। ভাবতে থাকে, আমি তো প্রকৃত অক্সিজেন দিতে পারব না বাসুদেব। ভালোবাসার অক্সিজেনও কোনো কাজে লাগে না, সে তো দেখতেই পেলাম। আমি কি তোমাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারব? আমার ভালোবাসার অক্সিজেন কি অত শক্তিশালী হবে, বাসুদেব? আমি কি তোমাকে বাঁচাতে পারব?