শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন
শিক্ষার্থী:জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যায়
শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রিয় পঠিত বিষয় নৃ-বিজ্ঞান। নৃ-বিজ্ঞান বিভাগ বাংলাদেশে প্রথম চালু হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই বিভাগ থেকে প্রতি শিক্ষাবর্ষের শেষের দিকে এসে অর্জিত তাত্ত্বিক জ্ঞান মাঠপর্যায়ে যাচাই করতে মাঠ গবেষণায় পাঠানো হয়। ২০১৮-২০১৯ শিক্ষাবর্ষে বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষ ও চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীরা মাঠ গবেষণা করতে যায় মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ থানার খাসিয়া পুঞ্জি ও মণিপুরি পাড়ায়।
মাঠ গবেষণার জন্য নির্ধারিত সময় ছিল ২০ থেকে ২২ নভেম্বর। নির্ধারিত সময়ে ৩টি বাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সকাল ৮টায় ক্যাম্পাস থেকে মৌলভীবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। বিকেল ৪টায় মৌলভীবাজারের পৌঁছার আগে পানসি রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার সেরে নেন সবাই। রাতে সবার থাকার ব্যবস্থা হয় এনজিও সংস্থা হিড বাংলাদেশের হিড বাংলাদেশ রেস্ট হাউজে। রেস্ট হাউজে পৌঁছে বিশ্রাম নিতে নিতে সন্ধ্যা নেমে আসে পাহাড়ঘেরা কমলগঞ্জে। আগামীদিনের মাঠ গবেষণার প্রস্তুতি সেরে পাহাড়ঘেরা রেস্ট হাউজ দেখতে বের হয় সবাই। রেস্ট হাউজটি এত সুন্দর করে গোছানো যে, কেউ কেউ দার্জিলিং বা বান্দরবান ভেবে ভুল করবেন। শীতের রাত, পাহাড়ি রেস্ট হাউজ, সিলেটের চা বাগানের ফ্রেশ চা পাতা দিয়ে এক কাপ চায়ের সাথে বন্ধুদের আড্ডা চলছিল বেশ সময় ধরে। পরদিন সকাল থেকে যেহেতু মাঠকর্ম শুরু তাই রাত ১২টার মধ্যেই সবাইকে নিজ নিজ রেস্ট হাউজে ফিরে যেতে হয়।
পরের দিন ভোর না হতেই সকালের নাস্তা সেরে ক্ষুদে গবেষকরা রওনা দেয় খাসিয়া পুঞ্জির উদ্দেশ্য। আসল মাঠকর্ম তো সেখানেই। যাত্রাপথে পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ আর চা বাগানের মিতালি দেখে সবাই ভাবছে আহারে যদি সারাজীবন এখানেই মাঠকর্ম করে কাটিয়ে দেওয়া যেত!
খাসিয়া পুঞ্জিতে ঢোকার আগে কোর্স শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের মাঠে নৃ-বিজ্ঞানী হিসেবে যেসব সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে তা পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন। পুঞ্জিতে ঢোকার সাথে সাথে পুঞ্জির মন্ত্রী সবাইকে আমন্ত্রণ জানান। তিনি স্বাগত জানিয়ে নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে সবাইকে একটা ধারণা দেন। আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে শিক্ষার্থীরা নেমে পড়ে পুঞ্জিতে তাদের নিজ নিজ গবেষণার কাজে।
খাসিয়া পুঞ্জিতে মাঠকর্ম শেষ করে দুপুরের খাবারের বিরতির পর মণিপুরি পাড়ায় যান শিক্ষার্থীরা। সেখানেও গ্রুপে ভাগ হয়ে মণিপুরি পাড়ার নানা তথ্য তুলে আনেন ক্ষুদে নৃ-বিজ্ঞানীরা। মাঠ পর্যবেক্ষণে যা তথ্য উঠে এসছে তা তুলে ধরতে সন্ধ্যায় প্রেজেন্টেশনের আয়োজন করা হয় রেস্ট হাউজের ডাইনিং হলে।
প্রতিটি গ্রুপের প্রেজেন্টেশনে উঠে আসে চমকপদ তথ্য। প্রেজেন্টেশনে খাসিয়া পুঞ্জির ও মণিপুরি পাড়ার সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন শিক্ষার্থীরা। প্রেজেন্টেশন শেষে সবাই যখন বিশ্রাম নিতে যাচ্ছিল তখন সবাইকে সারপ্রাইজড দিলেন শিক্ষকরা। রাতে ক্যাম্প ফায়ার হবে, সাথে থাকবে ‘শব্দকর’ জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। ‘শব্দকর’ সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বী একটি জনগোষ্ঠী। পূর্বপুরুষ থেকে যারা গান-বাজনা ও সাংস্কৃতিক অর্চনার সাথে সম্পৃক্ত। সাংস্কৃতিক পরিবেশনার পাশাপাশি দারিদ্রপীড়িত এই জনগোষ্ঠী সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করাও এই আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।
পরদিন ফেরার পালা। কিন্তু প্রকৃতির নৈসর্গিক এই সিলেটে এসে চা বাগানে ঘোরা হবে না তা কি করে হয়। তাই পরদিন ফেরার পথে মাধবপুরের চা বাগানে একটা রৌদ্রোজ্জ্বল দুপুর কাটিয়ে আসে নৃ-বিজ্ঞানীরা।
ক্যাম্পাসে উদ্দেশ্যে যখন বাস ছেড়েছে তখনো ‘চা কন্যা ভাস্কর্য’-এর সাথে ছবি তোলা হয়নি কারো। তাই ছবি তুলতে বাস আবার থামাতে হলো। গবেষণা, চা বাগান ঘোরা, সিলেটের চা আর খাসিয়া পুঞ্জির পানের স্বাদে মুগ্ধতা নিয়ে শেষ বিকেলে ক্যাম্পাসে ফিরছে সবাই। কিন্তু কেমন জানি সবাই চুপচাপ, নিষ্প্রাণ। নীরবতা ভাঙতে বাসের পেছনের যাত্রীরা গান শুরু করে দিল। ধীরে ধীরে খালি হতে থাকে বাসের সামনে সিট। শিক্ষকরা কেন বাদ যাবেন, তারাও যোগ দিলেন গানে। গবেষণার অভিজ্ঞতা নয় শুধু, চা পাতা কিনে নিতেও ভুল করেনি চাপ্রেমীরা।
