পশ্চিমা বিশ্বের মানুষেরা বোকা। কারণ, তাহারা কাজ করে প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করিবার জন্য। অন্যদিকে তৃতীয় বিশ্বের মানুষেরা খুব ভালো করিয়া জানে, কী করিয়া তাহার প্রতিষ্ঠানকে ভাঙাইয়া খাওয়া যায়। ইহা ঠিক যে, একটি প্রতিষ্ঠান হইল সোনার ডিম পাড়া হাঁস, কিন্তু এই হাঁসটির পেট হইতে অধিক ডিম পাইতে তৃতীয় বিশ্বের মানুষেরা পেট কাটিয়া ফেলিতেও দ্বিধা করে না। হাঁস মারা গেলে তাহাদের কী? তাহারা তো হাঁসের মালিক নহে। এই চিত্র সর্বত্র বিরাজিত। সরকারের উপর মহল হইতে রাস্তার ফুচকা বিক্রেতার বেতনভুক্ত ছোট কর্মচারী পর্যন্ত এই মানসিকতায় নিজেকে বিশেষ চালাক বলিয়া মনে করে।
বলিবার অপেক্ষা রাখে না, সরকার যখন একটি প্রকল্প গ্রহণ করে, তখন তাহার অনেক হিসাবনিকাশ থাকে। একটি বিশেষ লক্ষ্য থাকে। সরকারের ভাবমূর্তি, প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের বিষয় ছাড়াও উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে আগাইয়া লইবার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যাহারা এই সকল প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন, তাহাদের একেবারে উপর স্তর হইতে নিচের সারি অবধি বেশির ভাগ কর্মচারীর ভাবনা থাকে ঐ উন্নয়ন হইতে কী করিয়া ‘টু-পাইস’ অতিরিক্ত উপার্জন করা যায়!। এই জন্য দেখা যায়, বাস্তব পরিস্থিতির বিপরীতে অসংখ্য অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প। উহাতে সরকারের আর্থিক বোঝা বাড়িল কি না—তাহাতে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট মহলের কিছু আসে যায় না। আবার বেশির ভাগ প্রয়োজনীয় প্রকল্প কিংবা উন্নয়নকাজও যে সঠিক নিয়মে যথাযথভাবে সম্পন্ন হইয়া থাকে, তাহা নহে। যত বেশি নিয়মের ব্যত্যয় হইবে, তত বেশি বাঁকাপথে উপরি ইনকাম হইবে এই সকল কাজের সহিত সংশ্লিষ্টদের। এই ক্ষেত্রে তাহারা কেবল নিজেদের ব্যক্তিগত মুনাফাটাই চাহে, দেশের উন্নয়ন লইয়া তাহাদের মাথাব্যথা নাই।
তেমনিভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানসমূহের কর্মীরা সাধারণত নিজেদের আখের গোছাইতেই ব্যস্ত থাকেন। প্রতিষ্ঠানের লাভক্ষতি লইয়া তাহাদের মাথাব্যথা থাকে না বলিলেই চলে। অনেকে বলিতে পারেন, প্রতিষ্ঠানও বহু ক্ষেত্রে তাহার কর্মীদের প্রতি ন্যায্যবিচার করেন না, যখন তখন চাকুরিচ্যুত করিয়া থাকে। কিন্তু মনে রাখিতে হইবে, প্রতিষ্ঠানকে দেশের আইনের ভিতরে একটি নিয়মের মধ্যেই চলিতে হয়। এই জন্য প্রতিষ্ঠান যাহা করে নিয়মের মধ্যে করে। কোনো প্রতিষ্ঠানেরই সাধারণত যথেচ্ছাচার করিবার সুযোগ নাই। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা যদি মনে করেন তাহারা বসন্তের কোকিলের মতো, বসন্ত ফুরাইলেই প্রতিষ্ঠানকে বিধ্বস্ত রাখিয়া ফুড়ুত করিয়া উড়িয়া যাইবেন, তাহা হইলে সেই সকল প্রতিষ্ঠান কী করিয়া মহিরুহ হইয়া উঠিবে? তৃতীয় বিশ্বে এই চিত্র সবচাইতে বেশি দেখা যায় বিধায় এইখানে অর্ধশতাব্দী, এমনকি শতাব্দী কাল ধরিয়া খুব অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠানই টিকিয়া থাকিতে পারে। অথচ উন্নত বিশ্বের মানুষেরা তাহাদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করিয়া থাকেন। প্রতিষ্ঠানকে তাহারা নিজের সত্তার অংশ বলিয়া মনে করে। এই জন্য প্রতিষ্ঠানগুলিও তাহাদের শিকড় বিছাইতে পারে বহু দূর অবধি, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া তাহারা মাথা উঁচু করিয়া টিকিয়া থাকে।
প্রশ্ন হইল, নিজেদের ব্যক্তিগত আখের না গুছাইয়া প্রতিষ্ঠানের প্রতি নিবেদিত থাকিয়া উন্নত বিশ্বের মানুষেরা কি বোকামি করেন? তৃতীয় বিশ্বে যাহারা নিজের আখের গুছাইতে সদাব্যস্ত—তাহারাই তো চালাক! বলিবার অপেক্ষা রাখে না—অতি চালাকের গলায় দড়ি। সেই যে একটি বিখ্যাত কার্টুন আছে, একটি নৌকার এক প্রান্তে বসিয়া আছে চালক ও সুবিধাবাদী কিছু লোক, অন্য প্রান্তে আছে কিছু সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষের প্রান্তে নৌকাটির তলায় হঠাত্ একটি বড় ফুটো হইয়া যায়। সেই ছিদ্র ঠিক করিতে সাধারণ মানুষ যখন প্রাণপণ চেষ্টা করিতেছে, তখন অন্য প্রান্তের সুবিধাবাদীরা নিজেদের লইয়া আত্মনিমগ্ন রহিয়াছে। ভাবিতেছে, নৌকার ঐ প্রান্তে ফুটো হইলে আমাদের কী—আমাদের প্রান্ত তো ছিদ্র হয় নাই। প্রকৃতপক্ষে, দেশের উন্নয়নকে নষ্ট করিয়া, সোনার ডিম পাড়া হাঁসের পেট কাটিয়া, প্রতিষ্ঠানের প্রতি ন্যূনতম ভালোবাসা না রাখিয়া সুবিধাবাদী চালক মানুষেরা অল্প কিছুদিন ভালো থাকিতে পারেন মাত্র। উন্নত বিশ্ব কেন উন্নত হইয়াছে, তাহার উত্তর তাহাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার ভিতরেই লুকাইয়া রহিয়াছে। সুতরাং তৃতীয় বিশ্ব নাকি উন্নত বিশ্বের মানুষ প্রকৃত চালাক—তাহা আর বলিবার অপেক্ষা রাখে না।
