মীজানুর রহমানের সঙ্গে আমার দেখা আজ থেকে ৩০ বছর আগে, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে। হালকাপাতলা গড়নের মানুষটির মাথার চুল কাশবন। পরনের রুচির সঙ্গে মানানসই হালকা রঙের হাফশার্ট আর প্যান্ট। পায়ে হালকা ধরনের জুতো। কেন্দ্রের নিচতলায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে মীজানুর রহমানের মুখোমুখি হয়ে বললাম, আপনার পক্ষী সংখ্যাটা কিনতে চাই। দাম ৩০০ টাকা, আমি ছাত্র—অত টাকা দিয়ে কিনতে পারব না।
তিনি বললেন, তুমি শুক্রবার বাসায় এসো। এখানে তো পত্রিকা আনা হয় না। বাসায় এলে দেখা যাবে। তিনি বাসার ঠিকানা দিলেন। পরের শুক্রবার সকালের দিকে ধানমন্ডিতে, আবাহনী মাঠের পশ্চিমে দোতলা একটা বাড়ির সামনে দাঁড়ালাম। বাড়িটার চারদিকে অনেক জায়গা। বসলাম মীজান ভাইয়ের বৈঠকখানায়। অনেক প্রশ্ন করলেন, উত্তর দিলাম। ভাবির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। চা-বিস্কুট খেয়ে যখন পক্ষী সংখ্যাটা হাতে দিলেন আমি ১০০ টাকা বাড়িয়ে দিলে, তিনি বললেন, ‘তুমি টিউশনি করে পড়ছো। লেখার চেষ্টা করছ। বন্ধুর বাসায় আমার পত্রিকা দেখে আগ্রহী হয়ে আমার সঙ্গে দেখা করলে কেন্দ্রে। বাসায় আসতে বললাম, এলে। এত পরিশ্রম করো তুমি, আবার ছাত্র—তোমার টাকা দিতে হবে না।’
বাজি রেখে লিখছি, মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার সম্পাদক মীজানুর রহমান সাহিত্য এবং সংস্কৃতি ভালোবেসে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন। পত্রিকাটাকে ভালোবাসতেন গভীরভাবে। পত্রিকা ঘিরে যত কাজ নিজে করতেন। একটা ভালো লেখার জন্য লেখকের বাড়ি দিনের পর দিন যেতেন, অবশ্য হেঁটে। সংসার চালানো খুব কষ্ট হতো কিন্তু পত্রিকা ছিল ধ্যান ও জ্ঞান।
একবার পত্রিকা বের করতে গিয়ে টাকার টানাটানিতে পড়েন মীজান ভাই। বিজ্ঞাপন পাচ্ছেন যা, সেই বিজ্ঞাপনের টাকা পাবেন পত্রিকা প্রকাশের পর। কী আর করা, স্ত্রীর সোনার অলংকার বন্ধক রেখে পত্রিকা বের করলেন। কিন্তু অভাবের হাত, অলংকার আর আনা হয়নি। কোনোভাবে এই খবর পৌঁছে যায় পটুয়া কামরুল হাসানের কানে। তিনি প্রথমে বকলেন মীজান ভাইকে। বকার পর টাকা দিয়ে বললেন, যাও বউমার অলংকার নিয়ে এসো।
কলকাতা ছিল মীজানুর রহমানের শৈশবকালের পাদপীঠ। পড়েছেন মিত্র ইনস্টিটিউটে। কলকাতার সেই অমৃত স্মৃতি ধারণ করে লিখেছেন অসামান্য বই ‘কমলালয়া কলকাতা’। বইয়ের ভাষা মীজানীয় ঘরানার অপূর্ব আর সোঁদা গন্ধমাখা। বইয়ের ছবিও আঁকছেন তিনি। মীজানুর রহমানের আরেকটি বই ‘কৃষ্ণ ষোলোই’। পাকিস্তান আন্দোলনকে সামনে রেখে ১৯৪৭ সালের জিন্নার ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে পালনের সময়ে কলকাতায় যে নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে, বালক মীজানুর রহমান বেভুল পথে হাঁটতে হাঁটতে সব নিজের চোখে দেখেছেন। সেই দেখার বিষাক্ত স্মৃতির ইতিহাস নিয়ে লিখেছেন বই কৃষ্ণ ষোলোই। বইটি পড়ার সময়ে গোটা মানব জাতির প্রতি একধরনের বিবমিষা তৈরি হয়।
এসব পাশবিক জীবন যন্ত্রণার পাদপীঠে আবার কিছু মানুষ ফুল ফোটায়, স্বপ্নের পথ রচনা করে, নিজেকে জ্বালিয়ে অন্যকে আলোকিত করেন। অন্যকে আলোকিত করার প্রবহমান ধারার একজন মীজানুর রহমান। তিনি জন্মেছিলেন বিক্রমপুরের টোলবাসাইল গ্রামে। জীবনের শৈশবের অনেকটা কেটেছে কলকাতায়। কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে ভর্তি হয়েছিলেন আর্ট কলেজে। কিন্তু বর্ণান্ধ হওয়ার কারণে তিনি ছবি আঁকার জগতে থাকতে পারেননি। চাকরি করেছেন বেশ কয়েকটা প্রতিষ্ঠানে। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘গাঙচিল’ নামে একটি প্রেসও। কিন্তু সেই প্রেসে ব্যবসার চেয়ে লেখকদের আড্ডাই চলত বেশি। যে আড্ডায় যোগ দিতেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, কথাসাহিত্যিক মাহমুদুল হক।
নানা ঘাট, নানা পথ পার হয়ে আশির দশকের শুরুতে প্রকাশ করছেন অভিনব নামের একটি অনন্য পত্রিকা—‘মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা’। শুরুতে নামের কারণে অনেকের ভ্রু কুঁচকে গেলেও অচিরেই দেখতে পেলেন, প্রকৃতপক্ষে পত্রিকাটি মীজানুর রহমানেরই। কারণ জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ, সবটাই নিজের হাতে অতিব যত্ন করে সুচারুভাবে সম্পন্ন করতেন।
আমরা যে সাত্ত্বিক মানুষ বলি, মীজানুর রহমান সত্যিকার অর্থেই সাত্ত্বিক মানুষ ছিলেন। সত্, ন্যায়পরায়ণতা এবং অম্প্রদায়িক অসামান্য মানুষের প্রতিকৃতি মীজানুর রহমান। পত্রিকার সম্পাদনার প্রসাদগুণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সম্পাদকদের সম্পাদক, এই বাক্যটি লিখেছিলেন মীজানুর রহমান সম্পর্কে কবিশ্রেষ্ঠ শামসুর রাহমান। তিনি সাধারণ সংখ্যার পাশাপাশি সম্পাদনা করেছিলেন শামসুর রাহমান সংখ্যা, কৃষ্ণদয়াল বসু সংখ্যা, পটুয়া কামরুল হাসান সংখ্যা, কবি আহসান হাবীব সংখ্যা। মানুষ্য সংখ্যার বইরে সম্পাদনা করেছিলেন বৃক্ষ ও পরিবেশ সংখ্যা, পক্ষী সংখ্যা, বিশাল বিশাল দুই খণ্ডে গণিত সংখ্যা। গণিত একটি জটিল বিষয়। সেই জটিল গণিতকে কেন্দ্র করে দুই পর্বে, দুটি সংখ্যা করেছিলেন তিনি। প্রতিটি সংখ্যার পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত শত। চির আধুনিক, বাঙালিয়ানার জাগরণের এক অনন্য মানুষ মীজানুর রহমান। জীবন ও জগেক তিনি ধারণ করেছিলেন শুদ্ধতার নিরুপম সৌন্দর্য ও সংগ্রামের পানপাত্র হিসেবে।
কর্মের তুখোড় মেধাবী মানুষের কি মৃত্যু হয়? না, কর্মমুখর মানুষেরা কর্মে বেঁচে থাকেন, যদিও পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। মীজানুর রহমান ২৬শে জুন পৃথিবীর মায়া ছেড়েছেন, কিন্তু এই বিস্ময়কর আকর পত্রিকা সম্পাদনা করে তিনি বেঁচে থাকবেন আমাদের সংস্কৃতি আর সম্পাদনার টেবিলে!
n লেখক :কথাসাহিত্যিক
