পাহাড়ে আম বিপ্লব

আপডেট : ২৫ জুন ২০২১, ২২:০৫

নীরবে এক বিপ্লব ঘটে গেছে। জঙ্গলে ঢেকে থাকা পাহাড়ের গায়ে এখন সবুজ আমের বাগান। থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা আম দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। এই তো দুই যুগ আগেও পাহাড়ের আম খাওয়া যেত না। গাছে শত শত আম পেকে যেত কেউ তা খেতে পারত না। কারণ, কীটনাশকের অভাব ও সঠিক পরিচর্যা না পাওয়ায় সেসব আমে পোকা ধরত। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। সমতলের মতো পাহাড়েও আমের বিপ্লব ঘটে গেছে। প্রতি বছরই পাহাড়ে আম চাষের জমি বাড়ছে। বাড়ছে ফলন। পাহাড়ের আমচাষিদের বাড়তি আয়ের পথ দেখাচ্ছে আম।

পার্বত্য জেলাগুলোতে চাষিরা আম বিপ্লব ঘটিয়েছেন। একসময়ের সমতল জেলা থেকে আসা আমই চাহিদা মেটাত পাহাড়ের মানুষের। এখন রাজশাহী কিংবা চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো এ পার্বত্য এলাকায়ও আমের জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। বাণিজ্যিকভিত্তিক পরিকল্পিত আম চাষ করে পাহাড়ে উন্নত জাতের আম  উত্পাদনের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছেন চাষিরা। শুধু সরকারি সাহায্য-সহায়তায় নয়, চাষিরা নিজেদের কঠোর পরিশ্রম আর প্রচেষ্টায় পাহাড়ের অনাবাদি টিলায় উন্নত জাতের আম চাষে ঈর্ষণীয় সফলতা এনেছেন।

একসময়ের জুম ভূমি অথবা ঘন জঙ্গল তাই এখন সেজে উঠেছে আমবাগানে। আম্রপালিসহ বিভিন্ন জাতের আম থোকায় থোকায় ঝুলছে গাছে। পাহাড়ের চেহারাই বদলে দিয়েছে। তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের ছোটবড় সব আমবাগানে এখন আমগাছের সারি নজর কাড়ছে সবার। বিশ্বের সবচেয়ে দামি আম জাপানের মিয়াজাকিসহ      দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের আমও চাষ হচ্ছে পাহাড়ের ঢালে। তবে, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোর অধিকাংশই দখল করে নিয়েছে ভারতীয় আম্রপালি আম।

তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে বান্দরবানে সবচেয়ে বেশি আম বাগান রয়েছে। বাণিজ্যিকভিত্তিক বড় বড় এগ্রো ফার্মের অধিকাংশ বাগানই এ জেলায় অবস্থিত। দেশে আমের জেলা হিসেবে খ্যাত রাজশাহী জেলার চেয়ে খুব একটা পিছিয়ে নেই আমাদের পার্বত্য জেলাগুলো। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খুব দ্রুতই আম উত্পাদনে রাজশাহী বিভাগের কাছাকাছি চলে আসবে পার্বত্য জেলাগুলো। কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, এ বছর রাজশাহী জেলায় ১৮ হাজার হেক্টর জমি থেকে ২ লাখ ১৫ হাজার ১০০ মেট্রিক টন আম উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অপরদিকে, এ বছর তিন পার্বত্য জেলা মিলে ১৩ হাজার ৩৪২ হেক্টর পাহাড়ি টিলায় আম চাষ হয়েছে। আমের উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৫১ হাজার মেট্রিক টন। তার মধ্যে খাগড়াছড়িতে ৩ হাজার ৩৬৯ হেক্টর জমিতে প্রায় ৩৫ হাজার মেট্রিক টন, রাঙ্গামাটিতে ২ হাজার ৩৯২ হেক্টরে ২৬ হাজার ৩১২ মেট্রিক টন এবং বান্দরবানে ৭ হাজার ৫৮১ হেক্টরে প্রায় ৯০ হাজার মেট্রিক টন।

১৯৯৮-৯৯ সালে কালিকাপুর মডেল প্রকল্পের আওতায় পাহাড়ে আম্র্রপালি আমের আবাদ শুরু হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে চাষিদের বিনা মূল্যে চারা, সার ইত্যাদি দিয়ে আম চাষে উদ্বুদ্ধ করে। কম সময়ে ফলন, অধিক উত্পাদন, সুস্বাদু ও বাজারে বেশ চাহিদা দেখা দেওয়ায় ক্রমশ বাগান সম্প্রসারিত হতে থাকে। একসময়ে ব্যক্তি উদ্যোগেই এখানে হাজার হাজার একর আমবাগান গড়ে ওঠে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মো. নাসির উদ্দিন চৌধুরি বলেন, ভালো ফলন ও অধিক লাভজনক হওয়ায় পাহাড়ের মানুষ আম চাষে ঝুঁকে পড়েছে।

গুইমারা উপজেলার হাফছড়ি ইউনিয়নের সফল আমচাষি মো. আলী জানান, একসময় দিনমজুুর ছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সহায়তায় ২০০১ সালে তিনি নিজস্ব পাহাড়ি টিলা ভূমিতে আমবাগান করে এখন তিনি আর্থিকভাবে অনেক সচ্ছল। গত বছর আম বিক্রি করে প্রায় ৬ লাখ টাকা লাভ করেন। এ বছর ফলন খুব ভালো হওয়ায় লাভও অনেক বেশি হবে বলে জানালেন তিনি। মো. আলীর মতো আম চাষের মাধ্যমে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ পার্বত্য এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অবস্থা অনেক পালটে গেছে।

রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের তুলনায় এবার খাগড়াছড়িতে ফলন অনেক ভালো হয়েছে। পার্বত্য এলাকার সীমানা পেরিয়ে চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ  বিভিন্ন সমতল জেলায় সরবরাহ হচ্ছে এখানকার আম। আম্রপালি, মল্লিকা, রাংগুই, বারি-৪-সহ  সব জাতের আমের ফলই এ বছর ভালো হয়েছে। বিভিন্ন আমবাগান সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, চাষিরা স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের নিয়ে গাছ থেকে আম পাড়ছেন। প্রতিটি আম্রপালি গাছে গড়ে ৫০ কেজির মতো আম ধরেছে। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই আম্রপালি তোলা শুরু হয়। খাগড়াছড়িতে ভালো মানের আম্রপালি খুচরা বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৫৫-৬০ টাকা এবং পাইকারি ৪৫-৫০ টাকা দরে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, ফেনী, কুমিল্লার পাইকারি ব্যবসায়ীরাই বাগানের সিংহভাগ আম কিনে নিয়ে যায়। এ বছর অনলাইনের মাধ্যমেও আম বিকিকিনি চলছে। চাষিরা বাগানের আমে ফরমালিন বা কোনো বিষাক্ত ওষুধ প্রয়োগ করেন না। বিষমুক্ত হওয়ায় এখানকার বাগানগুলোর আমের চাহিদাও সবার কাছে বেশি।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ জুলফিকার আলী ফিরোজ বলেন, পার্বত্য এলাকার মাটি ও আবহাওয়া বিভিন্ন জাতের আম চাষের জন্য খুবই উপযোগী। তিনি বলেন, পাহাড়ে উত্পাদিত আমের বেশি ব্যবহারের জন্য আম প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপন এবং সংরক্ষণের জন্য হিমাগার নির্মাণ জরুরি। এতে চাষিরা ফলের ন্যায্যমূল্য পাবে এবং বিপুল পরিমাণ ফল পচে যাওয়া থেকে রক্ষা পাবে।