সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি সুখের ঠিকানা?

আপডেট : ২৬ জুন ২০২১, ২২:০৩

বর্তমান যুগ অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগ। কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও স্মার্ট ফোন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় তথ্যপ্রবাহকে করেছে একদম সহজ। মুহূর্তের মধ্যেই পৃথিবীর এক প্রান্তের তথ্য অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে ইন্টারনেটের বদৌলতে। স্বভাবতই ইন্টারনেট, কম্পিউটার ও স্মার্ট ফোন মানবজীবনের অপরিহার্য সঙ্গী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত অধিকাংশ সময়ই আমাদের কাজকর্ম কিংবা বিনোদন সবকিছুর নিত্যসঙ্গী এই ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলো। ইন্টারনেটের কল্যাণে আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, মেসেঞ্জার, ইমো, লিংকডইন ও উইচ্যাট ইত্যাদির ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। আমরা আমাদের নিত্য জীবনের সুখ-দুঃখ, ব্যর্থতা, সফলতাসহ সব ধরনের কাজকর্ম তুলে ধরার চেষ্টা করি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে; যা মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে হাজার হাজার মানুষের কাছে।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটু চোখ বুলালেই দেখতে পাওয়া যায় হাজার হাজার মানুষ সুখের পেছনে তাড়া করছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু সত্যিকারের সুখের খোঁজ কেউই পাচ্ছে না। একটু পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা ধরনের গ্রুপ কিংবা পেজ রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন ধরনের মজাদার কনটেন্ট পোস্ট করা হয়। সেটা হতে পারে গান, নাচ, আবৃত্তি, ব্লগিং, ফানি ভিডিও, মিমস, কৌতুক ইত্যাদি। এই গ্রুপগুলোতে লাখ লাখ সদস্য কিংবা ফলোয়ার রয়েছে; যা দেখলে মনে হয় এসব গ্রুপেই জীবনের সব সুখ নিহিত এবং এই মানুষগুলো এগুলো দেখে কিংবা শুনে সত্যিকারের সুখ খুঁজে পায়। তবে বাস্তবতা হলো এই যে, সুখ খোঁজার এই চেষ্টা শুধু একটা ব্যর্থ প্রচেষ্টা মাত্র। সত্যিকারের সুখ কখনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই গ্রুপ কিংবা পেজগুলোতে পাওয়া কখনোই সম্ভব নয়। কারণ, এখানে সত্যিকারের মানুষের তুলনায় মুখোশধারী মানুষের সংখ্যা বেশি। বর্তমান সময়ে পরিবার এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমরা নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর এসব সুখের উেসর দিকে। প্রকৃতপক্ষে এই গ্রুপ এবং পেজগুলো সাময়িক সুখ দেয় মাত্র। দীর্ঘস্থায়ী ও সত্যিকারের সুখ শুধু পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে যথাযথ জীবনযাপনের মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীলতার জন্য বিশেষত তরুণ প্রজন্ম পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকিত্ব ও বিষণ্নতায় ভুগছে এবং এই দুটি সমস্যা বর্তমান সময়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যেটি তরুণ প্রজন্মকে ঠেলে দিচ্ছে আত্মহত্যার দিকে। অন্যদিকে বয়স্করাও ঝুঁকছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দিকে। কারণ, বৃদ্ধ বয়সে যখন সন্তান এবং নাতি-নাতনির সঙ্গে মিলেমিশে একসঙ্গে জীবনযাপন করার কথা তখন তারা একাকী জীবনযাপন করছেন। কারণ, সন্তান তো আগেই পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে! তাইতো বাধ্য হয়ে বৃদ্ধরাও ঝুঁকে পড়ছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, সুখের খোঁজে হেঁটে চলেছেন নিরন্তর। হন্যে হয়ে সুখ খুঁজছেন ফেসবুক কিংবা ইউটিউবের পর্দায়। তবে সত্যিকারের সুখ কেউই পাচ্ছেন না!

একটা সময় ছিল যখন ইন্টারনেট, কম্পিউটার কিংবা স্মার্ট ফোন ছিল না। ছিল না তথ্যের অবাধ প্রবাহ। মানুষ তখনো কিন্তু সুখের খোঁজ করত নিজেদের পরিবারের মধ্যে কিংবা সামাজিক নানান আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। সে সময়ে মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের বন্ধন ছিল দৃঢ়। সন্তান ও মা-বাবা তখন একসঙ্গে একই জায়গায় বসে খাবার খেতেন। নানা রকম সুখ-দুঃখের গল্প করতেন। বিভিন্ন সময়ে আয়োজিত হতো নানা ধরনের খেলাধুলা কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের; যার মাধ্যমে সব মানুষ ভেদাভেদ ভুলে আত্মার বন্ধনে মিলিত হতো একে অপরের সঙ্গে। মানুষে মানুষে হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে তৈরি হতো পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন।

এখন ভাবার সময় এসেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো কি আসলেই আমাদেরকে সুখের সন্ধান দেয়? সত্যিকারের সুখ পেতে হলে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে পরিবার ও সমাজের মানুষের সঙ্গে আত্মিক বন্ধন তৈরি করতে হবে। হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সত্যিকারের মানবিক মানুষ হয়ে উঠলে তবেই আমরা হবো সত্যিকারের সুখী মানুষ।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়