প্রাকৃতিকভাবেই নারী-পুরুষের শারীরিক গঠন, বৈশিষ্ট্য ও কর্মে কিছু বৈচিত্র্য রাখা হয়েছে। তবে এ বৈচিত্র্য কারো দুর্বলতা নয় বরং সৃষ্টিকে টিকিয়ে রাখা ও ভারসাম্য রক্ষার হাতিয়ার। সৃষ্টির শুরু থেকেই নারী এই রহস্যময় পৃথিবীর অর্ধাঙ্গিনী। সব অর্জন ও প্রাপ্তির সমান অংশীদার। তবুও যুগের পর যুগ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীদের ওপর অত্যাচার, শোষণ ও নির্যাতন করে এসেছে। আর নারীসমাজে নীরবেই প্রতিবাদের দানা বেঁধেছে। তবে বাংলাদেশের নারীদের আশার আলো ফুটেছিল ১৯৭২ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্র ও গণজীবনের সব পর্যায়ে নারীদের সমঅধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয় এবং নারী ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে রাষ্ট্রের বিশেষ বিধান প্রণয়নের ক্ষমতাও সংযোজন করা হয় (অনুচ্ছেদ ২৭ ও ২৮)। তারই ধারাবাহিকতায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ অনুসরণ করেই বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পরপরই সব পর্যায়ে লিঙ্গ সমতা, নারীর উন্নয়ন এবং ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার জন্য নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন করেন এবং সেসব বিধিকে বাস্তবিক অর্থে সব পর্যায়ে সুসংহত ও কার্যকর করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করছেন। অর্থনৈতিকভাবে নারীদের সাবলম্বী করে তোলা, শিক্ষায় শতভাগ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করা, আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নারীদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা এবং রাজনীতিতে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণকে উত্সাহিত করার জন্য জননেত্রী শেখ হাসিনার গৃহীত উদ্যোগ ও সাফল্য অভাবনীয়।
তবে বর্তমান সমাজে নারী অধিকারের নামে কিছু ভুল ধারণার ছড়াছড়ি রয়েছে। সিনেমা ও বিজ্ঞাপনগুলোতে পুরুষকে স্বাভাবিক ও শালীন পোশাকে দেখা গেলেও নারীদেরকে বেশির ভাগই অর্ধনগ্ন অবস্থায় দেখা যায়। বাস্তবিক অর্থে, নারী অধিকার মানে অশ্লীল ও অর্ধনগ্ন পোশাক নয় বরং শালীনতাই হলো নারীর আসল অধিকার ও সম্মান। আবার নারীদের গভীর রাতে নিশাচর প্রাণীর ন্যায় চলাফেরা করতে পারাকে নারী অধিকার বলে দাবি করছেন অনেকেই। এসবের দাপটে নারীর অধিকার, সমতা ও সত্যিকার মুক্তির হাহাকার অন্তরালেই রয়ে যাচ্ছে।
বর্তমান সমাজে নারীরা আসলেই কতটা নির্যাতিত, কীভাবে বঞ্চিত, কতটা সংগ্রাম করে তাকে টিকে থাকতে হচ্ছে—এই রোজকার গল্পগুলোয় পরিবর্তন আনতে হবে। সমাজে নারীদের অবস্থান কতটা দুর্বিষহ তা আমরা নিত্যই দেখি। এসব এখন সামাজিক প্রথায় পরিণত হয়েছে। সারা পৃথিবীই নারীর যুদ্ধক্ষেত্র। কখনো কখনো এ যুদ্ধের সূচনা জন্মের আগেই শুরু হয়ে যায়। ভারতের বিভিন্ন স্থানে কন্যাভ্রুণ হত্যা এক অতি সাধারণ ঘটনা। এ ঘটনা পৃথিবীর নানা দেশেই প্রচলিত। জন্মের পরেও বিরামহীন এ যুদ্ধ। এখনই সময় নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার। সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত আইন ২০১৩)-এর কঠোর বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। এছাড়া নারীর প্রতি সহিংসতা, নারীদের উত্ত্যত্তকরণ, যৌতুক, ধর্ষণ, খুনসহ সব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। আইনের ফাঁক-ফোকরগুলো কঠোর হস্তে বন্ধ করতে হবে, প্রশাসনিক তদারকি বাড়াতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি সব ক্ষেত্রেই নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এভাবেই নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণে আমরা স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে সক্ষম হব।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
