একটা সময় পরে থেমে যেতে হয়। সবকিছু কেমন যেন স্থির হয়ে যায়। কেমন এক আচ্ছন্ন বোধের সৃষ্টি হয়। মহাকাল নামক অস্তিত্বের সঙ্গে একাত্মবোধ অঙ্কুরিত হয়। কতকাল ধরে এই যে এগিয়ে চলা, তার পরিসমাপ্তি ঘটে। মানুষ আর প্রকৃতির মধ্যে অন্তরঙ্গতা আদিম এবং অনিবার্য। ক্ষণকালের নেশায় মানুষ প্রকৃতিকে ভুলে যায়। ভুলে যায় তার অস্তিত্ব। নিজ কামনা সম্পাদনের মোহে আবদ্ধ হয়ে সতত ধাবমান অন্ধকূপের দিকে। মানুষের চিন্তাধারা কেমন যেন একঘেয়ে। সেই পুরোনো প্রবৃত্তিতে নিয়ত চলমান। আপন অস্তিত্ব সংরক্ষণের নিমিত্তে কেবল অর্থ, ক্ষমতা, ভোগ, বিলাস, লালসা, খ্যাতি, আকাঙ্ক্ষা, রক্তের পেছনে ছুটে চলা। মানুষ তার হাত রক্তে রাঙায় নতুন বাসনা নির্মাণে। নিত্যনতুন অধিকারের লোভে প্রবৃত্ত হয় নতুন খোলসে। মানুষ আসলে অসহায় এক জীব। সাধারণ দৃষ্টিতে মানুষ নিজেকে ক্ষমতাশীল, অবশ্যম্ভাবী, নিয়ন্তা হিসেবে উপস্থাপন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তখনই তার চিন্তার প্রসারতা সেখানে আটকে যায়। আত্মতুষ্টিবোধ সম্পাদন হলেই তার দৃষ্টি, অনুসন্ধান ক্ষীণ হয়ে আসে। অধিকাংশ মানবসত্তা জীবনে কোনো অর্থই খুঁজে পায় না। তার সরলরেখা জীবন জীবনালেখ্য শূন্য, অসার, তত্ত্বহীন, বায়বীয় ও প্রশ্নহীন। তার ভেতরে নেই কোনো জিজ্ঞাসা ও অনুসন্ধান। চেতনাবিহীন স্থূল অভিগামী এক স্বচ্ছন্দবোধের বাহক। গণ্ডিবদ্ধ আবরণে ঢাকা পুরো শরীর, মগজ আর অন্তরাত্মা। নেই কোনো আরোহণ; চিত্তের অবারিত সম্প্রসারণ। এই যে চোখ মেলে দেখার অক্ষমতা, তার গতি অনিঃশেষ। বছর অতিবাহিত হয়, দেহ শীর্ণ হয়ে পড়ে। শক্তি ক্ষয় হয়ে আসে, সমস্ত মজ্জার অবসান উপস্থিত। তৈরি হয় এক স্তব্ধতা। শূন্য ও যোগ-বিয়োগের মাঝেই চলতে থাকে প্রকৃতি এবং মানুষের পরস্পর সমাবেশ। এই যে অবিরাম একটা তত্পরতা, কিন্তু উত্পন্নবিহীন স্তব্ধ স্থিরতা কোনো কিছুরই আগমন ঘটায় না।
চিত্তের দুয়ার খুলে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে অসীমতার পানে। এই যে মনের দরজাটা বদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে, তাকে উন্মোচন করতে হবে। চিত্তের দীনতা মানুষকে যে কতটা নিচে নামিয়ে দেয়, বসিয়ে দেয় নিম্নস্তরে; সে অবস্থার কথা আমরা কেউ ভাবি না, চিন্তা করি না, কখনো গভীরভাবে তলিয়ে দেখি না। আমাদের চিন্তা-চেতনা বড়ই সাময়িক। হালকা বিষয়াদির প্রতি মানবসমাজের উত্সাহ, আগ্রহ, নিবেদন বরাবরই চিরন্তন। জাগতিক চাহিদা পূরণই মানুষের প্রধান লক্ষ্য হয়ে থাকে। চিন্তা-দর্শন ভাবনার আগেই তো উদরপূর্তির কথা ভাবতে হয়। কী করে জাগতিক সব চাহিদা পূরণ সম্ভব হয়, কী করে দুমুঠো অন্নের সংস্থান করা যায়, কী করে খেয়ে-পরে নিজের ভবিষ্যত্ তথা অর্থ, সম্পদ, সম্মান, মর্যাদা, আত্মপ্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়—সেই প্রশ্ন সর্বাগ্রে আমাদের চোখে প্রতীয়মান হয়। তাই তো চিন্তাভাবনা, অনুসন্ধান, উন্মোচন আমাদের মাথায় থাকে না। কারণ তার আগেই তো মৌলিক চাহিদা পূরণ কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই যেখানে মৌলিক চাহিদা পূরণ অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে এসব অভিযাত্রার কোনো মূল্য থাকে না। তখনই চিত্তের দৈন্যতা বা চিন্তাচেতনার অভাব প্রকট হয়ে দেখা দেয়। গণ্ডিবদ্ধ চিন্তাধারা আমাদের পশ্চাত্পদ করে তোলে। জ্ঞানবিজ্ঞান, দর্শন, চিন্তায়, চেতনায় পিছিয়ে থেকে প্রযুক্তি-জ্ঞান-বিজ্ঞানের জন্য অন্য দেশ-সমাজের কাছে ধরনা দিতে হয়। সক্ষমতা প্রয়োগের এই অভাব প্রকট। মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমাদের চেতন-অবচেতন মন প্রথাগত ধ্যানধারণায় পড়ে থাকে। আমরা যে মননে-চিন্তায়-চেতনায় পিছিয়ে, তা আমরা স্বীকার করি না। আমাদের মধ্যে সেই মানসিকতা নেই। পুরোনো ঐতিহ্যগত ধ্যানধারণার কাঠামো আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকা আমাদের বাস্তবতা। আমাদের মধ্যে যে দীনতা তথা ব্যক্তিপূজা, অন্ধ সংস্কার, চাটুকারিতা, স্বার্থবাদিতা, হীনতা, দুর্নীতিসুলভ মনোভাব, পরশ্রীকাতরতা, কূপমণ্ডূকতা, অজ্ঞানতা, লিঙ্গবৈষম্য প্রভৃতির কথা সজোরে উল্লেখ করা যায়। এখনো প্রচলিত প্রথাগত বৈষম্য বিদ্যমান। আমাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, বিনয়ের অভাব প্রকট। পদমর্যাদার ভারে স্বাভাবিক মনুষ্যত্ব বোধটুকু হারিয়ে ফেলি, নিজের সর্বময় দাম্ভিকতা প্রচার করি, নিজেকে ক্ষমতাশীল, অপ্রতিরোধ্য ভাবি। আমার চেয়ারের অপর পাশে যে ব্যক্তি সেবাপ্রার্থী বা আমজনতা, তাকে আমরা হীন চোখে দেখি, তুচ্ছতাচ্ছিল্য গুরুত্বহীন ভাবি। এখানেই আমাদের মনমানসিকতার দৈন্য ভাব পরিলক্ষিত হয়। নিজের নীচতা স্পষ্ট হয়ে সমাজের আয়নায় প্রতিভাত হয়। বিনয়হীন সমাজ কখনো পারস্পরিক প্রদ্ধাবোধ শেখায় না। অন্যকে সম্মান করতে না জানলে নিজেকে অসম্মান করা হয়। হীন ব্যক্তিরূপে নিজেকে প্রকাশ করা হয়।
এদেশ সম্ভাবনাময় একটি রাষ্ট্র। সচেতন যুবসমাজই এ দেশের প্রধান ভরসা। অন্ধকারাচ্ছন্ন যুবসমাজ সেই জাতির ভবিষ্যত্ ঘন কালো মেঘে ঢাকা আকাশের বার্তা দেয়। মাদকাসক্তি, উগ্রবাদিতা, ধূমপান, ধর্মান্ধতা, পশ্চাত্পদ দৃষ্টিভঙ্গি এবং সব অপশক্তি থেকে তরুণ সমাজকে বিরত রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা অতীব আবশ্যক। পরিবর্তনের দিকে দৃষ্টি না দিলে পশ্চাত্পদতা থেকে যাবে। মনের সংস্কার উন্নত না হলে, সময়ানুক্রমে এই পশ্চাত্পদতা সমহারে পেছনের দিকে ধাবিত হতে থাকবে। পরিবর্তন অতি আবশ্যক। চিত্তের সম্প্রসারণ ছাড়া এই জীর্ণ স্তব্ধতার তিরোধান ঘটবে না। মানুষের যত জ্ঞানচক্ষু খুলবে, ততই সে সূত্র খুঁজে পাবে এগিয়ে যাওয়ার।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
