করোনায় আটকে আছে বিচার, দ্রুত রায় বাস্তবায়নের দাবি পরিবারের

আপডেট : ২৬ জুন ২০২১, ২২:৪০

বরগুনার বহুল আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের দ্বিতীয় বছর পূর্ণ হলো আজ। বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে ২০১৯ সালের এই দিনে প্রকাশ্যে শাহ্ নেওয়াজ রিফাত শরীফকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে বন্ড বাহিনী। পরে ঐ দিন বিকেলে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। নিহত রিফাতের স্বজনদের দাবি, আদালত খোলার সঙ্গে সঙ্গে যেন এ মামলার বিচার কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা হয়। অ্যাটর্নি জেনারেল এম এ আমিন উদ্দিন এ প্রসঙ্গে বলেন, করোনার কারণে সব মামলার বিচার কার্যক্রম বিলম্বিত হচ্ছে।

রিফাতকে কুপিয়ে জখমের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশব্যাপী নিন্দার ঝড় ওঠে। দাবি ওঠে দ্রুত দোষী ব্যক্তিদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির। এ ঘটনার পরদিন বরগুনা সদর থানায় ১২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরো ১০-১২ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহত রিফাত শরীফের বাবা আব্দুল হালিম দুলাল শরীফ। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের ছয় দিন পর এ মামলার প্রধান আসামি বন্ড বাহিনীর প্রধান সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। এছাড়া এই হত্যাকাণ্ডের ২০ দিন পর এই মামলার প্রধান সাক্ষী ও নিহত রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে দীর্ঘ তদন্ত শেষে ঐ বছরের ১ অক্টোবর বিকেলে প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্ক এ দুই ক্যাটাগরিতে ২৪ জনকে অভিযুক্ত করে বরগুনার         সিনিয়ার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ। এতে ১০ জন প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৪ জন অপ্রাপ্তবয়স্ককে আসামি করা হয়। এরপর আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের বিচারকাজ শুরুর জন্য জেলা ও দায়রা জজ আদালত এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের বিচার শুরুর জন্য শিশু আদালতে মামলাটি পাঠায়। পরে ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির বিচারকাজ শুরু করেন। আর একই বছরের আট জানুয়ারি বরগুনার শিশু আদালত অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৪ আসামির বিচারকাজ শুরু করে। পরে দেশে করোনা পরিস্থিতির অবনতির কারণে আদালত বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঐ বছরের ৮ মার্চ থেকে ছয় মাসের জন্য এ মামলার বিচার কার্যক্রম বন্ধ থাকে। পরে করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর ঐ বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির রায় ঘোষণা করে আদালত। এ রায়ে নিহত রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে হত্যাকাণ্ডের প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। রায়ে মিন্নিসহ ছয় আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। আর বাকি চার আসামিকে খালাসস প্রদান করে আদালত।

অন্যদিকে বিচারকাজ শেষে একই বছরের ২৭ অক্টোবর অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৪ আসামির রায় ঘোষণা করে বরগুনার শিশু আদালত। এতে হত্যাকান্ডে সরাসরি অংশ নেওয়ায় অপ্রাপ্তবয়স্ক ছয় আসামিকে ১০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে আদালত। এছাড়া চার জনকে পাঁচ বছর এবং এক আসামিকে তিনি বছরের কারাদণ্ড দিয়ে তিন জনকে খালাস প্রদান করা হয়। পরে নিম্ন আদালতের এ রায়ের পর উচ্চ আদালতে আপিল করেন দণ্ডিত সব আসামি। তবে করোনার কারণে আদালত বন্ধ থাকায় থমকে আছে এ মামলার বিচার কার্যক্রম। এ মামলার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি, রাকিবুল হাসান ওরফে রিফাত ফরাজী, আল কাইয়ুম ওরফে রাব্বি আকন, মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত, রেজওয়ান আলী খান ওরফে টিকটক হূদয় ও মো. হাসান।

মিন্নির জরুরি চিকিত্সার

আবেদন পরিবারের

বরগুনা (উত্তর) প্রতিনিধি জানান, রিফাত হত্যাকাণ্ডের রায় ঘোষণার পর থেকেই কারাগারে আছেন মিন্নি। তার পরিবারের দাবি, জেলখানার একাকিত্ব আর আবদ্ধ পরিবেশে দিনে দিনে মিন্নির শারীরিক অবস্থা একেবারেই খারাপ হয়ে গেছে। তার জরুরি চিকিত্সার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন তারা। রিফাত হত্যা মামলার রায় ঘোষণার ৯ মাস পরও মিন্নিকে নির্দোষ দাবি করেছেন তার বাবা মো. মোজাম্মেল হোসেন কিশোর। শুক্রবার নিজ বাড়িতে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, মিন্নি কোনোভাবেই দোষী না এবং ও কোনো হত্যা পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিল না। এটা কেউ প্রমাণও করতে পারেনি। কুচক্রী মহল মিন্নিকে এই মামলায় জড়িয়ে ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত করেছে। মিন্নিও আমার কাছে বলেছে, ‘আব্বু, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। উচ্চ আদালতে আমি বেকসুর খালাস পাব। সত্যের জয় একদিন হবেই।’ রিফাত হত্যা মামলার রায়ের পর গত বছরের ২৯ অক্টোবর বরগুনা জেলা কারাগার থেকে মিন্নিকে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর থেকে এ কারাগারেই রয়েছেন তিনি। করোনার কারণে সপ্তাহে একবার স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান মিন্নি।