ভালো, তবে যথেষ্ট নয়

আপডেট : ২৭ জুন ২০২১, ২১:১৪

কৃষ্ণাঙ্গ ফ্লয়েড হত্যার রায় ও বর্ণবাদের অবসান

প্রসঙ্গ

শিফারুল শেখ

 

গায়ানা ফ্লয়েড নামের মেয়েটি কখনো হাইস্কুল গ্রাজুয়েশনে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরতে পারবে না। নিজের বিয়েতে সে কখনোই বাবার সঙ্গে নাচতে পারবে না। যতদিন জীবিত থাকবে ততদিন গায়ানা তার শিশু সন্তানটিকে তার বাবার কোলে তুলে দিতে পারবে না। কারণ ডেরেক শভিন নামের শ্বেতাঙ্গ পুলিশটি তার সেই মুহূর্তগুলো চুরি করেছে। অর্থাত্ শভিন গায়ানার বাবা জর্জ ফ্লয়েডকে চিরদিনের জন্য পৃথিবী থেকে বিদায় দিয়েছে। মিনেয়াপোলিসের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা শভিনের সাড়ে ২২ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই প্রথম কৃষ্ণাঙ্গকে হত্যায় কোনো শ্বেতাঙ্গ পুলিশের সাজা হলো। ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের পর যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ব জুড়ে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন তীব্রতর হয়েছিল। কিন্তু এই একটা হত্যার বিচারের মাধ্যমে কী যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে বর্ণবাদ ফ্লয়েডের মতো চিরতরে শেষ হয়ে যাবে? বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা হয়তো প্রথম এবং ভালো পদক্ষেপ, যথেষ্ট নয়।

 

যে সাজা পেল পুলিশ কর্মকর্তা

৪৫ বছর বয়সি শভিন গত মাসে সেকেন্ড ডিগ্রি হত্যাকাণ্ড এবং আরো কয়েকটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। বিচার চলার সময় তার আইনজীবী দাবি করেছিলেন, এই হত্যার ঘটনাটি আসলে ‘সরল বিশ্বাসে করা একটি ভুল’। সাজার রায়ে শভিনকে ‘প্রিডেটরি অফেন্ডার’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ সংস্থা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নজরদারি করে। সেই সঙ্গে শভিনকে আজীবনের জন্য অস্ত্রের মালিক হওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তিনি এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরো তিন সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আলাদাভাবে ফ্লয়েডের সাধারণ নাগরিক অধিকার লংঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

ফ্লয়েডের পরিবার এবং তাদের সমর্থকরা এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। সাড়ে ২২ বছরের কারাদণ্ড হলেও মিনেসোটা রাজ্যের আইন অনুযায়ী, শভিনকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। ঘটনাটি ১৩ মাস আগে ২০২০ সালের ২৫ মে মিনেসোটা রাজ্যের মিনেয়াপোলিস শহরে ফ্লয়েডকে হত্যার ঘটনা ঘটে। ১৮ বছর বয়সি ডার্নেলা ফ্রাজিয়ে এই ঘটনা মোবাইলে ভিডিও করায় শেষ পর্যন্ত বিচার হয়েছে। ভিডিওর বিনিময়ে সাংবাদিকতার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুলিত্জার পুরস্কার পেয়েছেন ফ্রাজিয়ে।

 

বর্ণবাদের অবসান হবে?

ম্যাপিং পুলিশ ভায়োলেন্স নামে একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্যানুসারে, গত বছর পুলিশের হাতে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে ১ হাজার ১২৭ জন মানুষের প্রাণ গেছে। এদের মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গ ও ল্যাটিন আমেরিকার ৪৮ শতাংশ। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে এই দুই গোষ্ঠীর হার মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ। ওয়াশিংটন পোস্ট সংবাদপত্রের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে আমেরিকায় পুলিশের গুলিতে মারা গেছে ১ হাজার ১৪ জন এবং বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে আমেরিকায় পুলিশের গুলিতে নিহতদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশির ভাগই কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান। ম্যাপিং পুলিশ ভায়োলেন্সের দাবি, আমেরিকায় পুলিশের গুলিতে শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় বেশি মারা যায় কৃষ্ণাঙ্গরা

ইউএস টুডের সম্পাদকীয় বোর্ড লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রে সাম্য এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য পর্বতসম পথ পাড়ি দিতে হবে। শভিনের শাস্তি প্রথমবারের মতো বিচার না পাওয়ার পথ হয়তো-বা বন্ধ করল।

বর্ণবাদের মূল্য কতটা তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে সাত বছর বয়সি গায়ানা। রায়ের পর হূদয়ভাঙানো এক ভিডিও বার্তায় গায়ানা বলেছে, বাবা বেঁচে থাকলে বলতাম, আমি তোমাকে খুব মিস করছি এবং তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু বাস্তবে বলার এই শব্দগুলো গায়ানার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে শভিন! প্রায় সাড়ে ৪ কোটি কৃষ্ণাঙ্গসহ সব আমেরিকানদের জন্য একটা সান্ত্বনা যে, শেষ পর্যন্ত শ্বেতাঙ্গ পুলিশের নিষ্ঠুরতার একটা শাস্তি অন্তত হলো।

জার্মান পত্রিকা ডয়চেভেলের ওয়াশিংটন স্টুডিওর প্রধান ইনেস পহল বলেছেন, এই বিচার ন্যায়বিচারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তবে দেশে পুলিশের নিষ্ঠুরতা বন্ধ করতে হলে অবশই পুলিশের সংস্কার আনতে হবে। যার কার্যক্রম অব্যাহত আছে। ফ্লয়েডের বোন ব্রিজেট ফ্লয়েড বলেছেন, এই কারাদণ্ড পুলিশের নিষ্ঠুরতার অভিযোগ যে শেষ পর্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয় সেটাই প্রমাণ করল। তবে এখনো আমাদের অনেক দূর যেতে হবে।