এম এ আলআমিন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ১৭ জুন জেনেভায় বৈঠক করেন। ক্ষমতায় আসার পর তিনি প্রথম ইউরোপ সফরে গিয়ে ব্রিটেনের কর্নওয়ালে জি-৭ শীর্ষ বৈঠকে অংশগ্রহণ শেষে ফেরার পথে পুতিনের সঙ্গে এ বৈঠক করেন। আশা করা হচ্ছে এর ফলে কেবল রুশ মার্কিন সম্পর্ক শুধু নয় বরং ইউরোপের সঙ্গেও রাশিয়ার সম্পর্কে নতুন আশার আলো সঞ্চার করবে।
রাশিয়া ইউরোপে গুপ্তচরবৃত্তি চালিয়ে যাচ্ছে বলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো মনে করে। জেনেভায় বাইডেনের সঙ্গে পুুতিনের যখন বৈঠকে ইইউ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন না। কিন্তু যেহেতু ইউরোপের মাটিতে সেই আলোচনা হয়েছে তাই বিষয়টি তাত্পর্যপূর্ণ। রাশিয়া নীতিগত পরিবর্তনে সম্মত হতে পারে, এমন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রুশ গোয়েন্দারা বেশ বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। পর্যবেক্ষকরা বলছেন ২০১৮ সালের পর প্রথমবারের মতো দুই নেতার মধ্যে এই বৈঠক হলেও এত সামান্যই অগ্রগতি হয়। রাশিয়া এক সময় জি-৭ এর সদস্য ছিল। তখন এটি জি-৮ নামে পরিচিত ছিল। ২০১৪ সালে ইউক্রেনে হস্তক্ষেপের পর দেশটি ঐ জোটের সদস্য পদ হারায়। দুই নেতা একে অপরের রাষ্ট্রদূতদের ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়েও একমত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠার পর গত মার্চে রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার করা হয়।
ইউরোপের দেশগুলো এখন খোলাখুলি অভিযোগ করছে যে, রুশ এজেন্টরা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যা চেষ্টাসহ, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নাশকতা ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো হ্যাক করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মস্কো এসব দেখেও না দেখার ভান করে। ইউরোপীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অভিযোগ, রুশ এসপিওনাজরা বর্তমানে এতটাই দুঃসাহসী হয়ে উঠেছে যে তারা তাদের কর্মকাণ্ড অন্যদের কাছে ধরা পড়ছে জেনেও সতর্ক হচ্ছে না। বিশেষ করে তাদের ডিজিটালি ট্র্যাক করা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সহজ। এস্তোনিয়ার অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান আর্নল্ড সিনিসালু বলেন, ‘তাদের মুখোশ খসে পড়েছে। রুশ গোয়েন্দা সংস্থা আন্তর্জাতিক আইন, নীতি বা মূল্যবোধের প্রতি সম্মান দেখানোর গরজ অনুভব করে না।’ ইউরোপীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরেই রুশ এসপিওনাজদের কর্মকাণ্ডের রাশ টেনে ধরার চেষ্টা করে আসছেন। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে আছে হত্যা, নাশকতা ও ভুল তথ্য ছড়ানো।
‘রুশ গোয়েন্দারা ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি স্থায়ী হুমকি হয়ে উঠেছিল। দিন দিন এদের তত্পরতা বেড়েই চলেছে’ মন্তব্য করেছেন ফিনল্যান্ডের সিকিউরিটি অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের ডিরেক্টর আনত্তি পেলতারি। রুশ এসপিওনাজদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে ২০১৪ সালের এপ্রিলে। চেক রিপাবলিকের কর্মকর্তারা বলেছিলেন তাদের অস্ত্রের গুদামে বিস্ফোরণের নেপথ্যে রুশ এজেন্টদের হাত আছে। ঐ ঘটনায় মস্কো ও প্রাগের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়। রাশিয়া শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চেক প্রজাতন্ত্রকেও ‘বৈরী দেশের’ তালিকাভুক্ত করে। এর কিছুদিন পর বুলগেরিয়ায় একজন অস্ত্র ব্যবসায়ীকে বিষ প্রয়োগের জন্য কয়েক জন রুশকে অভিযোগ করা হয়। দেশটির প্রসিকিউটররা ধারণা করেন এই ঘটনার সঙ্গে চেক রিপাবলিকের ঘটনার মিল আছে। কারণ ইউক্রেনের অস্ত্র সংগ্রহ রুটের মধ্যে চেক রিপাবলিক ও বুলগেরিয়ার অবস্থান। রাশিয়া অবশ্য এই ঘটনাসহ তাদের বিরুদ্ধে এসপিওনাজ কর্মকাণ্ডের অন্যসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। রুশ কর্মকর্তাদের দাবি তাদের দেশের সুনামহানি করার জন্যই পরিকল্পিতভাবে ইউরোপের দেশগুলো এসব প্রচারণা চালিয়ে থাকে।
রুশ কর্মকর্তারা যাই দাবি করুন ইউরোপের দেশগুলো তাতে প্রভাবিত হচ্ছে না। সাবেক সোভিয়েত আমল থেকেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দেশটির গোয়েন্দাদের সক্রিয় থাকার কথা জানা গেছে। এখন এ নিয়ে যা শোনা যাচ্ছে সেটি স্নায়ুযুদ্ধ যুগেরই প্রতিধ্বনি মাত্র। সোভিয়েত যুগের অবসান হয়েছে কিন্তু তার রেশ এখনো চলছে। ফিনল্যান্ডের ইন্টেলিজেন্স প্রধান পেলতারি বলেন, দুটো লক্ষ্য সামনে রেখে রুশ গোয়েন্দারা এখন তাদের তত্পরতা চালাচ্ছে। একটি হলো গোপন তথ্য হাতিয়ে নেওয়া, অপরটি বিদেশি রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করা।
