তৃতীয় বিশ্বের যে কোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন সেই দেশটিকে ক্রমশ নূতনতর উচ্চতায় উন্নীত করিতে সাহায্য করে। স্বাধীনতার পর হইতেই উন্নয়নের এক ম্যারাথন যাত্রা শুরু করিয়াছে বাংলাদেশ। ইহার বিকল্প নাই। গত এক যুগে উন্নয়নের এই যাত্রায় গতি বৃদ্ধি পাইয়াছে। ইহা নিঃসন্দেহে আনন্দের কথা। কিন্তু উন্নয়নের দায়িত্বে যদি জনপ্রতিনিধিদের বাহিরে কেবল আমলাতন্ত্রকে যুক্ত করা হয়, তাহা কিন্তু একটি দেশের জন্য কখনো দীর্ঘ মেয়াদে সুফল বহিয়া আনিতে পারে না। ইহার ফলাফল এখনই বহুলাংশে দৃশ্যমান। এখন কোথাও জলাবদ্ধতার সমস্যা দূর করিতে উন্নয়নকাজ শেষ হইবার পরও দেখা যায় সেইখানে অল্প বৃষ্টিতেই হাঁটুজল জমিয়া যাইতেছে। ইতিমধ্যে সরকারি তহবিলের অর্থ দিয়া নানান সময় বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে কোথাও কোথাও অনিয়ম-দুর্নীতির খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হইতে দেখিয়াছি আমরা। সুতরাং ইহা স্পষ্ট করিয়া বলা প্রয়োজন যে, সরকার যদি কেবল প্রশাসনের উপর নির্ভর করিয়া এবং জনপ্রতিনিধিদের কেবল পরামর্শক হিসাবে বিবেচনা করিয়া কিংবা পাশ কাটাইয়া বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেন, তাহা হইলে জবাবদিহিতার জায়গাটি বহুলাংশে ফাঁকাই থাকিয়া যায়। জনগণের নিকট জনপ্রতিনিধিদের যেই দায়দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার বিষয় দ্ব্যর্থহীনভাবে সম্পর্কিত, প্রশাসন বা আমলাতন্ত্র জনগণের নিকট ততখানি দায়বদ্ধ নহে। অথচ বহু ক্ষেত্রেই কেবল কথিত পরামর্শক হইবার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি বা সামাজিক প্রকল্পের ত্রুটিবিচ্যুতির দায় প্রধানত চলিয়া আসে জনপ্রতিনিধিদের উপর।
বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, প্রশাসনযন্ত্র একটি দেশের অন্যতম চালিকা শক্তি। অথচ ইতিপূর্বে আমরা প্রশাসন ক্যাডারে দক্ষ, মেধা ও সৃজনশীলতা লইয়া সরকারের নীতিনির্ধারক মহলকে উদ্বিগ্ন হইতে দেখিয়াছি। অভিজ্ঞজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, যে নথি তিন-চার দিনে অনুমোদিত হওয়া সম্ভব; কর্মকর্তাদের দক্ষতা, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার অভাবে তাহা বহু ক্ষেত্রে কয়েক মাস অবধি সময় নষ্ট করিয়া থাকে। প্রকৃতপক্ষে, আমলাতন্ত্রের জটিলতা বুঝিতে আমরা ব্রিটিশ আমলের দিকে একটিবার দৃষ্টি দিতে পারি। কারণ, বাংলাদেশের বর্তমান জনপ্রশাসন ব্রিটিশ শাসকের তৈরি জনপ্রশাসনেরই উত্তরাধিকার বহন করিতেছে। তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হইল, ব্রিটিশ আমলে ভারতবর্ষে আমলাতন্ত্রের আকার ছিল ছোট, কিন্তু দক্ষতায় ছিল সেরা। উপমহাদেশ ত্যাগের পূর্বে মাত্র দেড় হাজার আইসিএস-আইপিএস কর্মকর্তা দিয়াই ব্রিটিশরা ভারতবর্ষের আফগান সীমান্ত হইতে মিয়ানমার (বার্মা) পর্যন্ত বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনা করিতেন অত্যন্ত দক্ষতার সহিত। সুতরাং দক্ষ আমলা একটি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইতিপূর্বে আমরা সংবাদপত্রে দেখিয়াছি যে, আমাদের দেশে ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অদক্ষ সরকারি প্রশাসন ও দুর্নীতিকে বড় সমস্যা বলিয়া মনে করিতেছে একটি মহল। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বরাদ্দকৃত উন্নয়নকাজের একটি বৃহত্ অংশ নানা রকম অনিয়ম আর ফাঁকফোকর দিয়া শেষ করা হয়। অথচ সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারই উন্নত রাষ্ট্রগঠনের প্রথম শর্ত।
আমরা অনেক ক্ষেত্রেই দেখিয়াছি, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে আমলাতন্ত্র বহু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রধান নির্বাহীকেও বিব্রত করিতেও দ্বিধাবোধ করে না। তৃতীয় বিশ্বের কথিত গণতান্ত্রিক সরকারসমূহের চারিদিকেই আমরা অধিক পরিমাণে আগাছার জঞ্জাল সৃষ্টি হইতে দেখি। মনে রাখিতে হইবে, জবাবদিহিতা ব্যতীত একটি দেশ কখনো উন্নত হইতে পারে না। সেই জবাবদিহিতা দ্বারা সবচাইতে বেশি দায়বদ্ধ জনপ্রতিনিধিরাই। ইংরেজ জাতি আমলাতন্ত্র দিয়া বিভিন্ন উপনিবেশ পরিচালিত করিলেও নিজেদের দেশটিকে তাহারা কিন্তু পরিচালিত করিয়া থাকে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমেই। ইহাই উন্নত রাষ্ট্র গঠনের প্রধান শর্ত। আমরা যেন ইহা ভুলিয়া না যাই।
