আফগানিস্তান থেকে মার্কিন ও ন্যাটো সৈন্য প্রত্যাহার শুরু হওয়ার পর থেকে আমরা লক্ষ্য করছি দেশটি জুড়ে আফগান সরকারি বাহিনী ও নিরীহ বেসামরিক জনগণের ওপর তালেবানদের আক্রমণ বেড়েই চলেছে। মার্কিন ও ন্যাটো সৈন্য যাতে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত না হয়, সে ব্যাপারে অবশ্য তালেবান বাহিনী সজাগ রয়েছে, যাতে পশ্চিমা শক্তিগুলো তাদের সামরিক স্থাপনাগুলো সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব করার কোনো অজুহাত খুঁজে না পায়। তালেবানরা জানে যে, ২০২১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তান ছেড়ে যাবে। তাই তারা এখন সময়ের অপেক্ষায় আছে; তৈরি করছে ক্ষমতায় ফিরে যাওয়ার ভিত্তি। এজন্য তালেবানরা তাদের অস্ত্রের মজুত বাড়াচ্ছে এবং গ্রামগঞ্জে তাদের প্রভাব বিস্তার করছে।
১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসে তদানীন্তন দক্ষিণ ভিয়েতনামে যা ঘটেছিল, ঠিক তারই পুনরাবৃত্তি ঘটছে আজকের আফগানিস্তানে। সে সময় দক্ষিণ ভিয়েতনাম থেকে দ্রুত মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের ফলে মার্কিন মিত্ররা অসহায় হয়ে পড়ে। এবারও মার্কিন প্রশাসনকে আফগানিস্তানে যারা সহযোগিতা করেছিল এবং যারা ২০০১ সাল থেকে আফগানিস্তানের জাতীয় সরকারে অংশ নিয়েছেন, তারা এখন প্রমাদ গুনছেন। তালেবানরা আবার ক্ষমতায় আসার আগেই তারা অনেকেই আফগানিস্তান ত্যাগের পথ খুঁজছেন। বাইডেন প্রশাসনের আফগানিস্তান ত্যাগের সিদ্ধান্তটি আবারও এই কথাই প্রমাণ করে যে, ‘আমেরিকানরা আসলেই অবিশ্বস্ত মিত্র।’ আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই বছরের শেষ নাগাদ কাবুল, কান্দাহার এবং অন্যান্য বড় শহর তালেবানদের দখলে চলে যেতে পারে। আফগানিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়া ও সারা বিশ্বে এর কী প্রভাব ফেলবে তা এখন পর্যালোচনার বিষয়।
১৯৭৯-২০০১; এই দুই দশকে আফগানিস্তান মৃত্যু ও ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই দেখেনি। প্রথমত, ১৯৭৯-১৯৮৯ পর্যন্ত সিআইএর অর্থায়নে আফগান মুজাহিদ বাহিনীর সোভিয়েবিরোধী লড়াই চলে। এরপর ১৯৮৯ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বিশেষত ISI-এর পৃষ্ঠপোষকতায় তালেবান বাহিনীর উত্থান ঘটে। ২০০১ সালে মার্কিন ও ন্যাটো-সমর্থিত তালেবানবিরোধী জোটের হাতে পরাজয়ের পূর্ব পর্যন্ত চলে তালেবানদের তথাকথিত ‘ইসলামি আমিরাত’, যার অতি উগ্র রূপ বিশ্ববাসী দেখেছে।
২০০১ সালে কাবুলে একটি জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার পর আফগানিস্তানের পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। জনগণ প্রথমবারের মতো একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনা করে; প্রতিষ্ঠা করে বহুদলীয় গণতন্ত্র। জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলো নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়। আফগানিস্তানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিরা তাদের নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে পরবর্তী দায়িত্বপ্রাপ্তদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। নির্বাচনিপ্রক্রিয়া যে ত্রুটিমুক্ত ছিল তা নয়, কিন্তু কিছু ভুলভ্রান্তি সত্ত্বেও গণতন্ত্রের উত্তরণের পথে এটা ছিল বড় বিজয়।
আফগান নারীরা প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং নারী প্রার্থীদের ওপর বারবার আক্রমণ ঘটার পরেও অনেকে তাদের পুরুষ প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন। আফগান নারীরা পুলিশ, সামরিক, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী পদে যোগদান করেন। যেখানে তালেবানদের শাসনামলে ফুটবল, ক্রিকেট ইত্যাদি খেলাধুলা ছিল শাস্তিযোগ্য অপরাধ, সেখানে তালেবান পরবর্তী সময়ে আফগান ফুটবল ও ক্রিকেট দল, নারী দলসহ অনেক জাতীয় দল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কৃতিত্ব প্রদর্শন করে। আফগান ক্রীড়াবিদরা গত দুই দশকে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকে স্বর্ণসহ বিভিন্ন পদক জেতার গৌরব অর্জন করেন।
তালেবান শাসনকালে আফগানিস্তানে কোনো কার্যকরী অর্থনীতি ছিল না। এখন সেখানে একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; পরিচালিত হচ্ছে কয়েক ডজন বেসরকারি ব্যাংক। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অন্যান্য আর্থিক পরিষেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এখন আফগান ন্যাশনাল এয়ারলাইনসের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বেসরকারি এয়ারলাইনস চলাচল করছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রুটে। যদিও তালেবানরা সমস্ত স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়েছিল এবং অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিয়েছিল, সেগুলো আবার পুনর্নির্মিত হয়েছে। হাজার হাজার আফগান শিক্ষার্থী এখন বিশ্ব জুড়ে উচ্চতর পর্যায়ে পড়াশোনা করছে।
দুঃখজনকভাবে তালেবান বাহিনীকে সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত করার আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বিশ্ব জুড়ে আইসিসের জন্ম ও আল-কায়েদার পুনরুত্থান ঘটে। যখন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ব্যতিব্যস্ত, তখন তালেবানরা আফগান-পাকিস্তান সীমান্তে নীরবে পুনর্গঠিত ও পুনরুজ্জীবিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর আফগানিস্তানে যুদ্ধ চালিয়ে গেলেও তাদের মূল লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্য। সম্মুখ খণ্ডযুদ্ধে অনেক তালেবান সৈন্য ও তাদের কমান্ডার মিত্র বাহিনীর হাতে নিহত হলো বটে, তবে গভীর পাহাড়ি অঞ্চলে তালেবানদের ঘাঁটি অরক্ষিত থেকে গেল। এই পুরো সময় পাকিস্তান তাদের জন্য অভয়ারণ্য হয়ে থাকল, তাদের সামরিক অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ লাইনও থাকল অক্ষুণ্ন। তালেবানদের জন্য আর্থিক তহবিল কখনোই কোনো সমস্যা ছিল না, সারা বিশ্বেই, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে, তাদের দাতারা রয়েছেন। দাতারা তালেবানদের সাহায্য-সহযোগিতা করতে উন্মুখ, কেননা তারা মনে করেন, এটা ইসলামি জিহাদেরই অংশ।
ইরাক ও সিরিয়ায় পরাজয়ের পর অনেক আইএসের অনুসারী তালেবানদের দলে যোগ দিয়েছে। এই তালেবানদেরই একটি অংশ আবার আল-কায়দার সঙ্গে যুক্ত। তালেবানরা যদি বিজয়ীর বেশে আফগানিস্তানে ফিরে আসে, তাহলে বিশ্বকে সিরিয়া ও ইরাকের চেয়ে আরো ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে। স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যাবে, মেয়েদের ঘরের বাইরে যাওয়া বন্ধ হবে, লাইব্রেরি পুড়িয়ে ফেলা হবে, জাদুঘর ও শিল্পকর্ম ধ্বংস করা হবে। আফগানিস্তান বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। সেখানে একটি ইসলামি আমিরাত ঘোষণা হলে পাকিস্তান এবং উপসাগরীয় গুটিকয়েক দেশ ছাড়া বাকি বিশ্ব একে স্বীকৃতি দেবে না। আফগানিস্তান তখন সার্কের অন্তর্ভুক্ত থাকবে না।
পাকিস্তান চাইবে কাবুলে একটি তাঁবেদার সরকার প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু পুনর্জীবিত তালেবান সরকার হয়তো ইসলামাবাদের তাঁবেদারি করতে চাইবে না। পাকিস্তান সর্বদা ভারতের বিরুদ্ধে কৌশলগতভাবে আফগানিস্তানকে ব্যবহার করতে চেয়েছে, কিন্তু আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি যে তালেবানরা ‘ডুরান্ড লাইন’ (আফগান-পাকিস্তান সীমান্ত) স্বীকার করেনি এবং কখনোই পাখতুনিস্তানের দাবি ত্যাগ করেনি। এ ছাড়াও আফগানিস্তানের অভ্যন্তরেই তালেবানদের ভেতরে আল-কায়দা গোষ্ঠীর সঙ্গে আইএস গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে। অন্য দিকে তাজিক ও হাজারা শিয়া গোষ্ঠী তালেবানদের উত্থান মেনে নিতে চাইবে না। কারণ, বিগত দিনে তারা সুন্নি-পশতুন তালেবানদের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছে।
পাকিস্তানের মদতপুষ্ট তালেবানরা খোদ পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্যই হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে। তালেবানদের সঙ্গে মিলে তেহেরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) আবার পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে আফগানিস্তানের সীমান্তের কাছাকাছি পাকিস্তানের একটি বিমান ঘাঁটি নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে, যেখান থেকে আফগান সরকারকে সহায়তার জন্য মিত্র বাহিনী বিমান হামলা চালাতে পারবে। পাকিস্তানের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। একদিকে তাদের সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাখ্যান করা কঠিন, কারণ অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল, অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি স্থাপন করতে দিলে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে টিটিপি এবং অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আক্রমণ আরো বেড়ে যেতে পারে। পাকিস্তানের সীমান্তে একটি ‘ইসলামি আমিরাত’ তৈরি হলে তা হবে পাকিস্তানের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
আফগানিস্তানে তালেবানি শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে তা ভারতের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে। ভারত আফগানিস্তানে স্কুল, হাসপাতাল, সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থায় ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। হাজার হাজার আফগান শিক্ষার্থীকে ভারতের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশিক্ষিত করা হয়েছে। যদি আফগানিস্তান তালেবানদের হাতে চলে যায় তাহলে ভারতের এসব উদ্যোগ বিফলে যাবে। আফগানিস্তান হবে জিহাদিদের তীর্থভূমি। পিছিয়ে পড়া ভারতীয় মুসলমান যুবকরা ক্রমেই ঝুঁকে পড়বে ঘরের কাছের সেই ইসলামি আমিরাতের দিকে। কাশ্মীর এবং অপরাপর স্থানে জিহাদি তত্পরতা বৃদ্ধি পাবে।
নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশকেও একই সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে। জিহাদি রিক্রুটাররা আরো অধিকসংখ্যক জিহাদে যোগ দেওয়ার আগ্রহী প্রার্থী খুঁজে যাবে। কাছাকাছি একটি কট্টর ইসলামি রাষ্ট্র সৃষ্টি হলে বাংলাদেশে জিহাদি দলগুলো পুনরুজ্জীবিত হবে। তালেবানদের উত্থানে শ্রীলঙ্কা ও নেপালেও জিহাদি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে।
তালেবানদের উত্থান মধ্য এশিয়ার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। উত্তর-পশ্চিম চীনের উইঘুরবাসীদের মধ্যে আরো অসন্তোষ দেখা দেবে। যদি তালেবানরা শিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তত্পরতা চালায়, তাহলে স্বভাবতই ইরান হস্তক্ষেপ করবে। একটি অস্থিতিশীল পরিবেশের মধ্যে চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক কোরিডর (CPEC) বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এই প্রকল্প পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এসব কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান নীতি নিয়ে আরেকবার ভাবতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উচিত হবে এমনভাবে সেনা প্রত্যাহার করা, যাতে কাবুলের গণতান্ত্রিক সরকার টিকে থাকতে পারে। পশ্চিমা দেশগুলোকে এটা নিশ্চিত হতে হবে যে, তালেবানরা যাতে পাকিস্তান থেকে কোনো সহায়তা ও আশ্রয় না পায়। কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোকে তালেবানদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অর্থ সাহায্য থেকে বিরত রাখতে হবে। চীন এবং রাশিয়ারও আফগানিস্তানে শান্তি ও স্থিতিশীলতার ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। রাশিয়ার রয়েছে সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই করার সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা। সেন্ট্রাল এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে মিলে রাশিয়াকে একটি সহযোগিতার বলয় সৃষ্টি করতে হবে, যাতে আফগানিস্তান একটি বিশৃঙ্খল, অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত না হয়। কাশ্মীর অঞ্চলে জিহাদি অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ভারতকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। একটি স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক আফগানিস্তানের জন্য অবশ্যই সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক আফগানিস্তান বিশ্বশান্তির জন্য অপরিহার্য।
n লেখক :নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ট্রেজারার,
ইউনিভার্সিট অব এশিয়া প্যাসিফিক
