একজন বীর নারী সায়েরা বেগমের কাহিনি

আপডেট : ২৭ জুন ২০২১, ২১:৪১

২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসের ২৯ তারিখে আমি, উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ নির্বাচনি এলাকার নির্বাচিত সংসদ সদস্য (পরবর্তীকালে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটি, বিজয়নগরের সভাপতি), মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এ বি তাজুল ইসলাম (অব.) এমপি বরাবর একটি পত্র প্রেরণপূর্বক বীর মুক্তিযোদ্ধা সায়েরা বেগম নামের একজন বীর নারীকে মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের কথা বিবেচনায় নিয়ে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানপূর্বক মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানপূর্বক সব রকম সুযোগসুবিধা প্রদানের জন্য আবেদন করি। পত্রের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান সম্পর্কে যুদ্ধকালীন কমান্ডার, সাবসেক্টর কমান্ডার, মুকুন্দপুর, ৩ নম্বর সেক্টর (পরবর্তীকালে মেজর জেনারেল এবং প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (অব.), সশস্ত্র বাহিনী অধিদপ্তর) জেনারেল সায়ীদ আহমেদ, বীর প্রতীক কর্তৃক প্রদত্ত একটি প্রশংসাপত্র ও প্রত্যয়ণপত্রও সংযুক্ত করে দেওয়া হয়। আমি নিজে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমা (তদানীন্তন) মুজিব বাহিনীর একজন লিডার হিসেবেও তাকে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করি।

সায়েরা বেগমের অনুকূলে মেজর জেনারেল সায়ীদ আহমেদ, বীর প্রতীক কর্তৃক প্রদত্ত প্রত্যয়নপত্রে বলা হয় যে, “এই মর্মে প্রত্যয়ন করা যাইতেছে যে, মোছাম্মত্ সায়েরা বেগম, পিতা : মৃত আ. আজিজ, স্বামী :মো. শহিদউল্লাহ, গ্রাম :সোজামুড়া, পো : মুকুন্দপুর, ইউনিয়ন :পাহাড়পুর, উপজেলা ও জেলা :ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় অবদান রাখে। মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে ৩ নম্বর সেক্টরের আওতাধীন মুকুন্দপুরে শত্রু বাহিনীর ক্যাম্প কমান্ডারের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে সে আমার অধীনস্থ মুক্তি বাহিনীর সদস্যদেরকে নিয়মিত পাক বাহিনীর অবস্থান, গতিবিধি, অস্ত্রশস্ত্র ইত্যাদি সম্বন্ধে সঠিক তথ্য সরবরাহ করিত। তাহার প্রদত্ত খবর অনুযায়ী এক রাতে মুকুন্দপুরের পার্শ্ববর্তী একটি গ্রামে পাক বাহিনীর একটি দলকে এম্বুস করার অপারেশন সফল না হওয়ায় তাহার নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া যাওয়ায় সে মুক্তি বাহিনীর ঐ দলটির সঙ্গে ভারতে চলিয়া আসে এবং আমাকে শত্রু সম্পর্কে সঠিক তথ্য অবহিত করে। মুকুন্দপুর ক্যাম্পে অবস্থানরত শত্রুর সংখ্যা, প্রতিরক্ষা অবস্থান, অস্ত্রশস্ত্র ও ক্যাম্প অধিনায়কসহ সৈনিকের মনোবল সম্পর্কে সায়েরা প্রদত্ত সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে ১৮ ও ১৯ নভেম্বর ’৭১-এ মুকুন্দপুর শত্রু অবস্থানের ওপর আমরা আক্রমণ রচনা করি এবং অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করি। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, এই যুদ্ধে বহু পাক সেনা হত ও ২৯ জনকে বন্দি করিয়া মুকুন্দপুর শত্রুমুক্ত করি। পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে নিজের জীবনবাজি রাখিয়া সায়েরা বেগম মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে যে অসামান্য অবদান রাখিয়াছিল তাহা প্রশংসনীয়।

“আমি তার অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিসহ তাহার সর্বাঙ্গীণ সাফল্য ও কল্যাণ কামনা করি।”

২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে তাকে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে প্রত্যয়নপত্রে বলেছিলাম, “মোছাম্মত্ সায়েরা বেগম একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু বারবার আবেদন-নিবেদন করেও অদ্যাবধি তিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি লাভ করেননি। তার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয়ে সেনাবাহিনীর প্রাক্তন প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) মেজর জেনারেল সাইদ আহমেদ বীর প্রতীক (অব.)-এর প্রত্যয়নপত্রটিও সদয় দেখা যেতে পারে।

“আমি ব্যক্তিগতভাবে তার সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের মুজিব বাহিনীর একজন লিডার (কমান্ডার) হিসেবেও আমি মোছাম্মত্ সায়েরা বেগমের মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছি।                                                                                          

“এমতাবস্থায়, তাকে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানপূর্বক সর্বপ্রকার সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে সবিনয় অনুরোধ করছি।” 

জেনারেল সায়ীদ ও আমার প্রত্যয়ন সত্ত্বেও কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়নি। দুর্ভাগ্য যে, পুরো ’১৩ ও ’১৪ সাল অতিক্রম করে ২২/১১/২০১৫-তে বিজয়নগর উপজেলা থেকে জেলা প্রশাসক বরাবর সায়েরা বেগমের নাম মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতাভোগীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক বরাবরে পত্র প্রেরণ করেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, বিজয়নগর আখতার উননিছা শিউলী। ১৮/০১/২০১৬-তে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় মুক্তিযোদ্ধা ভাতাভোগীদের তালিকায় সায়েরা বেগমের নাম অন্তর্ভুক্ত করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়। ২৯/০৩/২০১৬-তে জেলা প্রশাসক ড. মোশাররফ হোসেন তার নাম তালিকাভুক্ত করতে মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবরে পত্র প্রেরণ করেন। ২৭/১২/২০১৬-তে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সম্মানি ভাতা প্রদান-সম্পর্কিত যাচাই-বাছাই কমিটির সভায় সায়েরা বেগমকে সম্মানি ভাতাভোগীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয় এবং জুলাই ২০১৬ থেকে তা কার্যকর করা হয়। ১৩/০২/২০১৭ তারিখে এক সুপারিশ মহাপরিচালক, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বরাবরে প্রেরণ করা হয় উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির পক্ষ থেকে, যাতে সায়েরা বেগমকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই কমিটি মন্ত্রণালয়ের দ্বারা গঠিত এবং এই কমিটির সভাপতি ছিলাম আমি, একজন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সদস্য হিসেবে। ফলাফল ২৪/০৪/২০১৯-এর পরিপত্রের নির্দেশনা মোতাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার তার ভাতা স্থগিত করে দেন। জানা গেল, মাননীয় মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সরাসরি ফোন করে তার ভাতা বন্ধের নির্দেশ দেন মৌখিকভাবেও। শুধু তা-ই নয়, গৃহীত সকল ভাতা ফেরত দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়!

সায়েরা বেগম ২০১৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার নাম তালিকাভুক্ত ও গেজেটভুক্ত করার জন্য একটি আবেদন করেন। উক্ত আবেদনপত্রে আমার সুপারিশ রয়েছে। এটি আমি নিজে মন্ত্রী মহোদয়ের হাতে সমর্পণ করি। তিনি ১০/০৭/২০১৮-তে উক্ত আবেদনের ওপর লিখেন ‘উপজেলার যাচাই-বাছাই কমিটির রিপোর্ট জামুকার সভায় অনুমোদনের পর।’ ফলাফল ওপরে বর্ণিত হয়েছে। সর্বশেষ ১৪/০১/২০২১-তে পুনরায় আমি একটি আধাসরকারি পত্রের মাধ্যমে সায়েরা বেগমের নাম গেজেটভুক্ত করে তার ভাতা পুনরায় চালু করার জন্য মাননীয় মন্ত্রীকে অনুরোধ জানাই। শুধু তা-ই নয়, বিষয়টি নিয়ে ন্যূনপক্ষে ১০ বারের অধিক মাননীয় মন্ত্রী, জামুকার অনেক সদস্য, সচিব ও জামুকার মহাপরিচালক বরাবর অনুরোধ-উপরোধ করে গেছি। সকলের বারংবার আশ্বাসের পরও অদ্যাবধি বিষয়টির কোনো সুরাহার পথ দেখছি না।

এক্ষণে প্রশ্ন যাব কোথায়? একজন বীর (নারী) মুক্তিযোদ্ধা সায়েরা বেগমের জীবনের এই করুণ কাহিনি কোথায় বলব? একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার জীবনের এই মর্মন্তুদ কাহিনি কোথায় বলব?

n লেখক : সংসদ সদস্য, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা, পঁচাত্তর-পরবর্তী প্রতিরোধ যোদ্ধা, সম্পাদক, মত ও পথ