দেশে করোনায় রেকর্ড প্রাণহানি হয়েছে। একদিনের পরিসংখ্যানে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন এ যাবত্কালের সর্বোচ্চ ১১৯ জন। সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যে গত ১৯ এপ্রিল এক দিনে ১১২ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, এতদিন সেটাই ছিল এক দিনে মৃত্যুর সর্বোচ্চ সংখ্যা। এদিকে গ্রামে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে করোনা সংক্রমণ।
এদিকে, গ্রামীণ এলাকায় সংক্রমণ আরো বাড়ার আশংকা প্রকাশ করে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্যবিভাগের শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মানাতে এমপি থেকে গ্রামের মেম্বার পর্যন্ত সর্বস্তরের জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব দিতে হবে। কারণ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে মানুষের ঘরে ঘরে যাওয়া সম্ভব না। জনপ্রতিনিধি ও কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করা ছাড়া লকডাউন কিংবা শাটডাউন যে কখনোই বাস্তবায়ন হবে না- সেটা দেশের মানুষ সম্প্রতি উপলদ্ধি করেছে। কোনো আগাম বার্তা নেই, প্রস্তুতি নেই, দরিদ্র শ্রেণিপেশার মানুষের জন্য আর্থিক সহায়তা নেই, লকডাউন কার্যকরে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেই, শুধু কাগজে কলমে লিখে দিলেই লকডাউন বাস্তবায়ন হবে না। তাদের অভিযোগ, গত কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন জেলায় এবং অঞ্চলে ‘কাগুজে লকডাউন’ চলছে। কর্মজীবী মানুষ রাস্তায় নামছেন, দুর্ভোগে পড়ছেন। কিন্তু যে জন্য লকডাউন, সেই উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না।
করোনা মোকাবেলায় যে লকডাউন ঘোষণা করা হচ্ছে সেই বিষয়ে স্বাস্থ্যের অনেক নীতি-নির্ধারকরা জানেন না। তাদের সঙ্গে কোন যোগাযোগও করা হয় না। এদিকে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, এক বছর ধরে মাস্ক পরে তারা করোনা রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। কোন সমস্যা হয়নি। মাস্কই টিকা। গ্রামের মানুষের মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে। অপরিকল্পিতভাবে লকডাউন ঘোষণা দিলে দলে দলে মানুষ গ্রামে যাবে। আবার লকডাউন উঠিয়ে নিলে দলে দলে ঢাকায় ফিরে আসবে। এতে গ্রামে ও রাজধানী দুই জায়গাতেই সংক্রমণ বাড়বে। জনপ্রতিনিধি ও কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করতে পারলেই মাস্ক পরা, স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং লকডাউন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে ডাক্তার-নার্স ও স্বাস্থ্য সেবা কর্মীদের পাশাপাশি ৬৫ জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী করোনা রোগীদের সার্বিক দেখভালের দায়িত্ব পালন করছেন। লাশও দাফন করে আসছেন। ছাত্রলীগের এসব নেতাকর্মীদের কর্মকান্ডে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ডাক্তার-নার্সরা। মানবিক এই সেবামূলক কর্মকান্ড চালাতে গিয়ে ১৫ জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তারপরও তাদের মনোবল ভাঙ্গেনি। করোনা রোগীদের সার্বিক সহযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, করোনা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে। তাহলে নিরাপদ থাকা যাবে। আর টিকা আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে চলে আসছে। পর্যায়ক্রমে আরো আসবে। তিনি সবাইকে মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, করোনায় উচ্চ মৃত্যুতে শঙ্কিত হচ্ছি। জনপ্রতিনিধি ও কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করে মানুষের মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মানাতে হবে। লকডাউন বাস্তবায়নও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা ছাড়া সম্ভব হবে না। এটা করতে না পারলে সামনে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে।
সোসাইটি অব মেডিসিনের মহাসচিব ও মুগদা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, জনপ্রতিনিধি ও কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করা ছাড়া লকডাউন বাস্তবায়ন হবে না।
এদিকে, গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় কেবল খুলনা বিভাগেই মারা গেছেন ৩২ জন; ঢাকা বিভাগে ২৪ জন এবং রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগে ২২ জন করে মারা গেছেন। গত একদিনে মারা যাওয়া ১১৯ জনকে নিয়ে দেশে করোনাভাইরাসে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা ১৪ হাজার ১৭২ জনে দাঁড়াল। গত এক দিনে দেশে আরও ৫ হাজার ২৬৮ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। সব মিলিয়ে দেশে এ পর্যন্ত মোট ৮ লাখ ৮৮ হাজার ৪০৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন। শনাক্ত হওয়া নতুন রোগীদের মধ্যে ১৬৪৮ জনই ঢাকা বিভাগের। খূলনা বিভাগেও ১২০০ এর বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে গত এক দিনে। মারা যাওয়া ১১৯ জনের মধ্যে ৫৯ জনের বয়স ছিল ৬০ বছরের বেশি। ৩৪ জনের বয়স ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে, ১১ জনের বয়স ছিল ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে, ৯ জনের বয়স ছিল ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে এবং ৬ জনের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ছিল। তাদের ৭৫ জন ছিলেন পুরুষ, ৪৪ জন ছিলেন নারী।
