ছাদবাগানে সবুজের সান্নিধ্য

আপডেট : ২৮ জুন ২০২১, ০৯:৫৫

বাগান মানেই তো ফুলে-ফলে ভরা কোনো বিশাল উদ্যান নয়। গ্রামবাংলায় বাগান মানে ফলের গাছ আর বাড়ির উঠানে দেশি ফুলের বাহারি বাগান। শহুরে জীবনে তো আর তা সম্ভব নয়। শহুরে বাগান মানে গৃহকোণে প্রকৃতিকে ভালোবাসার ছোট্ট নিদর্শন ধরে রাখা। তবে, এখন শহুরে বাগানের ধারণাও পালটে গেছে। মানুষ ঘরের লাগোয়া ছোট্ট বারান্দার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে ছাদেই গড়ে তুলছে বিশাল বাগান। এই করোনাকাল এসে ছাদবাগানের প্রতি মানুষের আগ্রহ আরো বেড়েছে। কারণ, স্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, বাগানে কাজ করলে বা সবুজ প্রকৃতির কাছাকাছি থাকলে মানুষের মানসিক চাপ কমে। আজকের এই যান্ত্রিক জীবনে শরীর আর মনকে ফিট রাখতে প্রকৃতির কোনো বিকল্প নেই। ঘরের বাইরে যখন যাওয়া যাচ্ছে না তখন বাগানে কাজ করে সবাই নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চাইছেন।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ছাদবাগান

ছাদবাগান-শহুরে কৃষি: হাঁটি হাঁটি পা পা করে শুরু করা ছাদবাগান বাংলাদেশের শহুরে কৃষিব্যবস্থার শৌখিন পদযাত্রা বর্তমানে এক সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। যদিও, ছাদে বাগান কোনো নতুন ধারণা নয়। অতি প্রাচীন সভ্যতাতেও ছাদে বাগানের ইতিহাস রয়েছে। খ্রিষ্টের জন্মেরও পূর্বে মেসোপটেমিয়া ও পারস্যের জুকুরাক নামীয় পিরামিড আকৃতির উঁচু পাথরের স্থাপনায় বাগান ও ছোট গাছ লাগানোর জন্য স্থান নির্ধারণ করার নিদর্শন পাওয়া যায়।

বিশ্বব্যাপী নগরায়ণ বাড়ছে। ফলে শহুরে কৃষি নামক এক নতুন শব্দ আমাদের শব্দ ভান্ডারে যুক্ত হচ্ছে। এ কৃষির শুরুটা শৌখিন। ব্যাপক বাণিজ্যিক উত্পাদন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্ভব না হলেও ধীরে ধীরে পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কেবল বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের দেশে দেশে এর গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। শহরাঞ্চলে ফুল, ফল ও সবজির পারিবারিক বাগান এখন আর কেবলই শৌখিনতা বা পারিবারিক প্রয়োজন নয়। পরিবেশ রক্ষা আর নগরের তাপমাত্রা কমিয়ে আনতে অনেক দেশেই বাড়ির ছাদ, বারান্দা, গাড়ি বারান্দা, ফুটপাত, পার্ক, সরকারি খাস ভূমি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিটি পর্যায়ে কৃষি উত্পাদন বিশেষ করে উদ্যান ফসল ও বাহারি ফুলের গাছের সমন্বয়ে তৈরি করা হচ্ছে সবুজ নগরায়ণ। আমাদের দেশেও ছাদবাগানের মাধ্যমে ব্যক্তি পর্যায়ে শহরে সবুজায়ন শুরু হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক নয় বরং একান্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগেই এদেশে ছাদবাগানের সূচনা।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ছাদবাগান

খিলগাঁও সি ব্লকের বাসিন্দা আয়শা খানম তার চারতলা বাড়ির ছাদেই গড়ে তুলেছেন বিশাল ছাদবাগান। সেখানে ফলেছে আম, পেয়ারা, ডালিম, লেবুসহ নানা ফল ও ফুল। তিনি নিজেই যত্ন করেন গাছের। আয়শা খানম জানালেন, যখন বাড়ি একতলা ছিল তখন বাড়ির সামনের খোলা জায়গায় অনেক গাছ ছিল। বাড়ি করতে গিয়ে সেসব গাছ কেটে ফেলতে হয়েছে। তাই ছাদেই এখন বাগান করি। অবসর জীবনে এই ছাদবাগান আমার সবচেয়ে বড় সঙ্গী। আমার সময় কেটে যায় বাগানের দেখাশোনা করতে করতে। ফ্ল্যাট বাড়িগুলোতেও ছাদ ফাঁকা না রেখে বাগান করতে উত্সাহিত করা হচ্ছে বাসিন্দাদের। সবাই মিলে ছাদের জায়গা ভাগ করে নিয়ে যার যার মতো গাছ লাগাচ্ছেন।

শখের ছাদবাগানে  ফুল ফল সবজি

ছাদবাগান নগরের উষ্ণতা কমায়: শহরে ছাদবাগান স্থাপন করা হলে শহরের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি পর্যন্ত কমে আসে। আমাদের শহরগুলোতে ফাঁকা জায়গা দিন দিন কমে আসছে। ছাদবাগানের প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে কৃষিবিদ আবু কাউসার মো. সারোয়ার জানান, ইট-কাঠের ভবনের বদলে দ্রুতই বৃদ্ধি পাচ্ছে ইস্পাতের কাঠামো ও কাচে মোড়া বহুতল ভবন। বিশেষ করে জানালায় কাচ ও বাণিজ্যিক ভবনের টেকসই স্থাপনার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে হালকা কিন্তু শক্তিশালী ধাতব পাত, ফাইবার ও গ্লাস। সূর্যের তাপ ও আলো এ ধাতব ও কাচের কাঠামোর একটিতে পড়ে অপরটিতে প্রতিফলিত হয়। বারবার প্রতিফলনে ঐ স্থান ও এলাকার তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় সামান্য বেড়ে যায় এবং শহর জুড়ে তৈরি হয় অসংখ্য হিট আইল্যান্ড বা তাপ দ্বীপ। ভবনে বা এর কাঠামোতে বাগান স্থাপন করা হলে বাগানের গাছ এ তাপ শুষে নেয় এবং গাছের দেহ থেকে যে পানি জলীয় বাষ্প আকারে প্রস্বেদন প্রক্রিয়ায় বেরিয়ে যায় তা সেই স্থানের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি কমিয়ে আনে। অসংখ্য ছাদবাগান বা শহরের গাছপালা এ প্রক্রিয়ায় শহরের উচ্চ তাপমাত্রাকে কমিয়ে আনে।

ইত্তফাক/কেকে