সুলতান সুলেমানের সময়ের খাল এখন কেন কাটছেন এরদোয়ান!

আপডেট : ২৮ জুন ২০২১, ২১:২৭

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান সেই দেশের বৃহত্তম শহর ইস্তাম্বুলের ইউরোপীয় অংশকে দুই ভাগ করে একটি খাল খনন প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন, যার লক্ষ্য হচ্ছে করে কৃষ্ণ সাগর এবং মারমার ও ভূমধ্যসাগরের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা। 

সুয়েজ বা পানামা খালের আদলে কৃত্রিমভাবে খনন করা এই ‘ক্যানাল ইস্তাম্বুল’ বা ইস্তাম্বুল খালের লক্ষ্য হচ্ছে বসফরাস প্রণালীর বিকল্প তৈরি করে ওই দুই সাগরের মধ্যে আরও বেশি সংখ্যক জাহাজ চলাচলের পথ সুগম করা।

Is the Istanbul Canal Erdogan's personal or Turkey's national project? –  Middle East Monitor
 
কিন্তু তুরস্কের অনেক রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানী এবং পরিবেশবাদী এই খাল খনন প্রকল্পকে এরদোয়ান সরকারের একটি পাগলামি বলে বর্ণনা করছেন। তাদের মতে, এর মাধ্যমে ইস্তাম্বুল শহরের বিপদ বাড়বে এবং ওই অঞ্চলের পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। এরদোয়ানের যুক্তি হচ্ছে, এই খাল তার দেশের উন্নয়নে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। শুধু খাল খননই নয়, বরং এই প্রকল্পের আওতায় তৈরি হবে নতুন একটি আন্তর্জাতিক সমুদ্র বন্দর, কন্টেইনার টার্মিনাল, কিছু কৃত্রিম দ্বীপ এবং খালের দুই পাশ বরাবর বেশ কয়েকটি আধুনিক শহর।

এরদোয়ানের নেতৃত্বাধীন ‘এ কে পার্টি’ ক্ষমতায় বসার পর ২০১১ সালে এক জনসভায় তিনি এই খাল খনন করার ঘোষণা করেন। সে সময় অনেকেই একে ‘রাজনীতির চমক এবং কিছুদিন পর লোকে এর কথা ভুলে যাবে’ বলে মনে করলেও একেপি সরকার ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এই খাল খননের সম্ভাব্যতা নিয়ে নানা রকম সমীক্ষা চালায়। কিন্তু বসফরাসের বিকল্প একটি খাল খনন নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছিল বেশ অনেক আগে, সেই ওসমান বংশীয় সুলতান ‘সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের’ আমলে। তুর্কী পত্রিকা হুরিয়াতের খবর অনুযায়ী, তার আর্কিটেক্ট মিমার সিনান এই পরিকল্পনাটি তৈরি করলেও অজ্ঞাত কারণে তা বাতিল করা হয়। সুলতান তৃতীয় মুরাদের আমলে ১৬৯১ সালের ৬ই মার্চ এই খাল খননের জন্য একটি রাজকীয় ফরমান জারি করা হয়, কিন্তু সেটিও পরে বাদ হয়ে যায়। এভাবে মোট সাতবার খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কখনোই বাস্তবে পরিণত হয়নি ।

Istanbul Canal to become Erdogan's geopolitical tool, says expert -  Business & Economy - TASS

বসফরাস প্রণালী সামরিক এবং বাণিজ্যিক দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র পথগুলোর অন্যতম। এই প্রণালীকে, কীভাবে ব্যবহার করতে পারবে, তার জন্য রয়েছে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি, যাকে মন্ট্রো চুক্তি বলা হয়। এরদোয়ান সরকার মনে করছে, পশ্চিমা কিংবা রাশিয়া কোন পক্ষেরই তল্পিবাহক না হয়ে তুরস্ক এখন নিজের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভূ-রাজনৈতিক খেলায় একটা বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। সে জন্যেই তারা এমন একটি বিকল্প জলপথ তৈরি করতে চায়, যা মন্ট্রো চুক্তির শর্তেও জালে আবদ্ধ থাকবে না।

এদিকে ইস্তাম্বুল খাল খনন পরিকল্পনা নিয়ে তুরস্কের পরিবেশবাদীরা শুরু থেকেই বেশ সন্দিহান ছিলেন, এর বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। আর এই সমালোচকদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত যিনি, তিনি হলেন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীকে পরাজিত করা ইস্তাম্বুলের মেয়র একরাম ইমামোগলু। তিনি বলেন, ‘এই সিমেন্ট প্রকল্পের কথা ভাবলে আমি রাতে ঘুমাতে পারি না। এই প্রকল্প শেষ হওয়ার পর প্রথম যে ভাবনা সবাইকে ভাবিয়ে তুলবে তা হলো, স্বাস্থ্যকর পরিবেশে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার অধিকার। অর্থেও মূল্যে এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা যাবে না।’

ইত্তেফাক/এএইচপি