ল্যান্ড নাই কিন্তু লর্ড তো আছে!

আপডেট : ২৮ জুন ২০২১, ২১:৪৫

ঘটনাটি ঘটিয়াছে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কনকদিয়ায়। প্রেমের টানে ১৯ বত্সরের এক কিশোর আর ১৪ বত্সর বয়সি এক কিশোরী বাড়িছাড়া হইয়াছিল। কিন্তু কিশোরীর তো বিবাহের বয়স হয় নাই! সুতরাং ডাকা হইল সালিশ। বিধি বাম! সালিশের বিচারক ৬০ বত্সর বয়সি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নিজেই ঐ কিশোরীকে দেখিয়া পছন্দ করিয়া ফেলিলেন! সালিশের বিচারক হইয়া নিজেই আসামি হইয়া গেলেন! তিনি বিবাহ করিয়া বসিলেন ঐ কিশোরীকে! এমন নহে যে তিনি অবিবাহিত কিংবা বিপত্নীক। তাহার প্রথম স্ত্রী আছেন এবং সেই সংসারে তাহাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রহিয়াছে। ছেলেও বিবাহিত। সেই অর্থে নববিবাহিতা কিশোরীটি ঐ ইউপি চেয়ারম্যানের নাতনির বয়সি। কিন্তু তাহাতে তাহার কী আসে-যায়! তিনি এইরূপ বিবাহ করিয়া অনুতপ্ত নহেন বরং আনন্দিত। যদিও তিনি দাবি করিয়াছেন যে, ঐ কনের বয়স আঠারোর অধিক। অথচ বিদ্যালয়ে দেওয়া জন্মনিবন্ধন ও পঞ্চম শ্রেণি পাশের সনদ অনুযায়ী, ঐ কিশোরী কনের জন্মতারিখ ২০০৭ সালের ১১ এপ্রিল। অর্থাত্ সে প্রকৃত অর্থেই কিশোরী। কিন্তু কথায় আছে যে, জোর যাহার মুল্লুক তাহার! কিশোরীকে তাহার পছন্দ হইয়াছে আর সেই কিশোরীকে কিনা বিবাহ করিবে ১৯ বছরের আরেক যুবক? তাহা হয় কী করিয়া? সুতরাং নিজের ইচ্ছাটাই শেষ কথা। এইদিকে সালিসে এমন বিচার পাইয়া কিশোরীর সহিত পালানো কিশোর আত্মহত্যার চেষ্টা করিয়াছে। অভাগা কিশোর এখন বাউফল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রহিয়াছে।

ঐ ইউপি চেয়ারম্যান স্পষ্টতই মনে করেন যে, বিবাহ করিয়া তিনি একটি গরিব মেয়েকে উদ্ধার করিলেন এবং তাহার যেইরূপ দয়ার শরীর তাহাতে ভবিষ্যতেও হয়তো সুন্দরী গরিব মেয়ে দেখিলেই তাহাকে তাহার উদ্ধার করিবার ইচ্ছা জাগিতে পারে। তিনি যেন অনাথের নাথ! তিনি আগাইয়া না আসিলে কে উদ্ধার করিবে গরিব কিশোরীদের? যদিও দেশে বাল্যবিবাহ না করিবার শক্ত আইন রহিয়াছে। তবে তাহাতে তাহার কিছু আসে-যায় না। কারণ তিনি ইউপি চেয়ারম্যান, এলাকার তথাকথিত ‘লর্ড’। এই ধরনের ইউপি চেয়ারম্যানদের এমন কাণ্ডকারখানা আমাদের স্মরণ করাইয়া দেয় ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি জনপ্রিয় কৌতুক। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় পেশায় ‘জেনারেল কনসালট্যান্ট’। তাহার ভাষায়, ‘লোকেরে সব বিষয়ে জ্ঞান দেই।’ এই জন্য বাড়ির বাহিরে ভানু বিরাট করিয়া সাইনবোর্ড টাঙাইলেন। সেইখানে বড় বড় করিয়া লেখা—‘লর্ড ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়’। ভানু কেন নিজেকে লর্ড লিখিলেন? বিষয়টি ভানু জলের মতো সহজে বুঝাইয়া দিলেন। তিনি বলিলেন যে, ব্যাপার হইল দেশের বাড়িতে তাহার কিছু জমিজমা ছিল। জমি থাকা মানেই ‘ল্যান্ডলর্ড’। তবে তাহার সেই দেশের বাড়ির ল্যান্ড আর রইল না, কেবল পড়িয়া রহিল ‘লর্ড’। এই ‘লর্ড’রে তিনি কোথায় রাখিবেন? সেই কারণে নিজের নামের গোড়ায় লাগাইয়া দিলেন।

আমাদের দেশেও এই রকম অনেক লর্ড এখন আনাচে-কানাচে দেখিতে পাওয়া যায়। ইহার সহিত আরো একটি সমস্যা প্রকট হইল, একটি সমস্যার দায়িত্বশীল পদের ব্যক্তিরা ভিন্ন ভিন্ন কারণ ব্যাখ্যা করেন। একজনের কথার সহিত অন্যজনের কথার মিল নাই। যেমন, গত রবিবার রাজধানীর মগবাজারে ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর ইহার কারণ লইয়া ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গিয়াছে। কেহ বলিয়াছেন, কোনো ট্রান্সফরমার বিস্ফোরিত হইয়াছে। আবার কেহ বলিয়াছেন, কোনো ভবনের মধ্যে জেনারেটর কিংবা এসি হইতে বিস্ফোরণ ঘটিয়াছে। কেহ আবার বলিয়াছেন গাড়ির সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হইয়াছে। অথচ এই ব্যাপারে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স হইতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হইয়াছে। আলাদা বিশেষজ্ঞ কমিটিও গঠন করা হইয়াছে। সেই সকল তদন্ত শেষ হইবার পূর্বে দায়িত্বশীল পদে থাকিয়া ভিন্ন ভিন্ন মতামত দেওয়া কাম্য নহে। কিন্তু আধুনিক ‘লর্ডরা’ আগ বাড়াইয়া কথা বলিতে পছন্দ করেন। সেই কারণেই আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বক্তব্য লইয়া বকাবকি দেখিতে পাই।